সোমবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০১৬

নামাজের শুরুতে মুখে উচ্চারণ করে নিয়ত পড়া প্রসঙ্গে...

আসুন বুঝে নিই-তাহলে হাদিসে বর্ণিত নিয়াতের আসল অর্থ কি?
বুখারির ১ম খন্ডে, ওয়াহীর সুচনা অধ্যায়ে, ১ নং হাদিসে উল্লেখ আছে-
"উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সাঃ) বলেন- প্রত্যেক কাজের ফলাফল তার নিয়াতের উপর নির্ভরশীল।"
তাহলে হাদিসে যেহেতু নিয়াতের কথা বর্ণিত আছে তাহলে নামাজে মুখে নিয়া করা যাবে না কেন?
তাহলে আসুন একটু বুঝে নিই এই নিয়াতের আসল ব্যাখ্যা কি?
সাহাবারা (রাঃ) কি নামাজের সময় নিয়াত করতেন?
রাসুল (সাঃ) কি নাওয়ায়তুন...... পড়তেন?
নিয়তের অর্থঃ নিয়ত আরবী শব্দ। এর বাংলা অর্থঃ ইচ্ছাকরা , মনস্ত করা , এরাদা করা , সংকল্প করা। (মুনজিদ , ৮৪৯। ফতহুল বারী , ১।১৭)
শব্দটি আমরা বাংলাভাষী লোকেরাও ব্যবহার করে থাকি। যেমন আমরা বলিঃ আমি এ বছর হজ্জ করার নিয়ত করেছি। অর্থাৎ ইচ্ছা করেছি মনস্থ করেছি।
নিয়তের গুরুত্বঃ শরীয়তে নিয়তের গুরুত্ব অপরিসীম। ব্যক্তির আমল আল্লাহর নিকট গ্রহণীয় হয়না যতক্ষণে বান্দা তার নিয়ত সঠিক না করে নেয়। অর্থাৎ , আল্লাহর জন্যে তাঁর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে না করে নেয়। আল্লাহ বলেনঃ (তাদেরকে এছাড়া কোন নির্দেশ করা হয়নি যে , তারা খাঁটি মনে একনিষ্ট ভাবে আল্লাহর এবাদত করবে। (সূরা বাইয়্যিনাহঃ ৫)
নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ আমল সমূহ নিয়তের (ইচ্ছার) উপর নির্ভরশীল , আর প্রত্যেক ব্যক্তি তাই পাবে যাসে নিয়ত করবে। সুতরাং যে ব্যক্তি পার্থিব জীবনে সুখ-শান্তি লাভের উদ্দেশ্যে হিজরত করবে সে তাই পাবে। কিংবা কোন মহিলাকে বিবাহ করার উদ্দেশ্যে হিজরত করবে সে তাই পাবে"। (বুখারী , প্রথম হাদীস)
উক্ত হাদীসটিতে নবীজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর বক্তব্য স্পষ্ট যে , মানুষ তার নিয়ত অনুযায়ী প্রতিফল পায়। দৃষ্টান্ত স্বরূপ হিজরত। হিজরত অর্থঃ ইসলামের বিধি-বিধান পূর্ণ রূপে পালন করতে পারা যায়না এমন দেশ ছেড়ে সে দেশে যাওয়া যেখানে বিনা অসুবিধায় পালন করা যায়। অন্য কথায় , কুফরের দেশত্যাগ করে ঈমানের দেশে প্রত্যাবর্তন করা। [ফাতহুল বারী , ১।২১]
তাই কোন ব্যক্তি যদি এ কারণে দেশ ত্যাগ করে যে, সে যে দেশে যাচ্ছে সেখানে যাওয়ার তার উদ্দেশ্যে হল কোন রমণীকে বিবাহ করা বা দুনিয়াবী কোনসুবিধা অর্জন করা , তাহলে সে তাই পাবে। হিজরতের ফলে কোন নেকী পাবেনা। যদিসে ঈমান বাঁচানোর উদ্দেশ্যে হিজরত করতো , তাহলে নেকী পেত। কাজ একই কিন্তু নিয়তের পরিবর্তনের কারণে নেকী পাওয়া এবং না পওয়া নির্ভর করছে।
আমি এখানে আরেকটি উদাহরন দিচ্ছি,
ধরুন, কোন ব্যক্তি মসজিদে নামাজ পড়তে যাচ্ছে খুব সুন্দর একটি পাঞ্জাবী পরে, গায়ে আতর মেখে এই নিয়াতে যে- তার সুন্দর পাঞ্জাবী ও খুশবুদার আতর দ্বারা সে লোকজনের দৃষ্টিতে পড়বে ফলে লোকজন তাকে নামাজী বলবে।
এই নিয়াতে নামাজ পড়লে সে একটি নেকিও পাবে না। বরং সে গোনাহগার হবে।
পক্ষান্তরে সে ব্যক্তি যদি মসজিদে নামাজ পড়তে যায় এই নিয়াতে যে- সে কেবল একমাত্র আল্লাহ্‌কে সন্তুষ্টি করবে। লোকজনকে দেখানোর জন্য নয় তাহলে সে ঐ নামাজে অবশ্যই আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে উত্তম প্রতিদান পাবে ইনশাল্লাহ।
মহান আল্লাহ্‌ বলেনঃ বল, নিশ্চয়ই আমার সলাত, আমার যাবতীয় 'ইবাদাত, আমার জীবন, আমার মরণ সব কিছুই বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহ্‌র জন্যই নিবেদিত।” (আল-আন'আমঃ ১৬২)
প্রকৃত নিয়ত আসলে কিঃ
ইবনুল কাইয়ুম (রাহেঃ) বলেনঃ নিয়ত হচ্ছে , কোন কিছু করার ইচ্ছা করা এবং সংকল্প করা। উহার স্থান হচ্ছে অন্তর জবানের সাথে আসলে তার কোন সম্পর্ক নেই। এ কারণে না তো নবীজী হতে আর না কোন সাহাবী হতে নিয়তের শব্দ বর্ণিত হয়েছে(ইগাসাতুল্ লাহ্ফান , ১।২১৪)
সত্য প্রিয় ভাই! হ্যাঁ, প্রকৃতপক্ষে নিয়তের স্থান হচ্ছে অন্তর, মুখে বলা বা পড়ার সাথে এর কোন সম্পর্ক নেই।
উদাহরণ স্বরূপ , ধরুন আপনারগ্রামে মসজিদ উন্নতি কল্পে জালসা হচ্ছে। আপনি জালসায় আগত আলেমদের আলোচনা শোনার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হলেন। সাথে এক শত টাকাও নিলেন। সভা শেষে ১০০ টাকা দান করে বাড়ি ফিরলেন। বলুন তো , আপনি যে এ নেকীর কাজটি করলেন এর জন্য কি আপনাকে মুখে আরবী বা বাংলায় এরূপ বলতে হল কি যে- "হে আল্লাহ! আমাদের গ্রামে মসজিদের উন্নতি কল্পে আয়োজিত জালসায়, আগত উলামাদের আলোচনা শোনার উদ্দেশ্যে এবং এক শত টাকা দান করার উদ্দেশ্যে জালসা শুনতে উপস্থিত হলাম বা হতে যাচ্ছি?
যদি কেউ এরূপ বলে তখন আপনিই তাকে "মাথা খারাপ" বলে মন্তব্য করবেন।
তাই আসুন মুখে নিয়াত উচ্চারণ না করে অন্তরে করি।
ঐভাবেই নামাজ পড়ি যেভাবে রাসুল (সাঃ) পড়েছেন, এবং আমাদের শিখিয়েছেন।
বিদআত পরিহার করুন সুন্নাহ মেনে চলুন।

"যখন সত্য এসে মিথ্যার সামনে দাড়ায় তখন মিথ্যা বিলুপ্ত হয়। মিথ্যা তার প্রকৃতগত কারনেই বিলুপ্ত হয়। [সুরা বানী ইসরাইলঃ ৮১]

                             ----------------------------------------------------------------------------------
                            '' শুধু নিজে শিক্ষিত হলে হবেনা, প্রথমে বিবেকটাকে শিক্ষিত করুন। ''
বিজ্ঞাপনের জন্য

বিদআত কি? ধর্মে বিদআতের কু-প্রভাব ও বিদআতকারীর পরিণাম কি?


বিদআত শব্দের আভিধানিক অর্থ= নতুন আবিষ্কার।
শরিয়াতের পরিভাষায় বিদআত হচ্ছে ধর্মের নামে নতুন কাজ, নতুন ইবাদাত আবিষ্কার করা।

নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, “যে ব্যক্তি এমন আমল করবে যার ব্যাপারে আমার শরীতের নির্দেশনা নেই, উহা প্রত্যাখ্যাত।” (মুসলিম হা/৩২৪৩)

তিনি আরো বলেন- " নিঃসন্দেহে সর্বোত্তম কথা হচ্ছে আল্লাহ্‌র কিতাব, সর্বোত্তম পদ্ধতি হচ্ছে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর পদ্ধতি। আর নিকৃষ্ট কাজ হচ্ছে শরীয়াতে নতুন কিছু সৃষ্টি করা, এবং প্রত্যেক বিদ'আত হচ্ছে ভ্রষ্টতা। (মুসলিমঃ ৭৬৮)

"রাসুল (সাঃ) আরো বলেছেন-যে আমার সুন্নাহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে সে আমার দলভুক্ত নয়। [বুখারীঃ ৫০৬৩]
অর্থাৎ যে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর পদ্ধতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে নতুন নতুন ইবাদাত আবিষ্কার করবে অথবা আল্লাহ্‌র নৈকট্যের জন্য নতুন নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করবে সে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর পদ্ধতিকে তুচ্ছ মনে করল।

যে কোন সাধারন মানুষকে যদি জিজ্ঞাস করা হয় যে- আল্লাহ্‌ যথাযথ ইবাদের জন্য এবং আল্লাহ্‌র নৈকট্য লাভের জন্য রাসুল (সাঃ) এর দেখিয়ে দেয়া পদ্ধতি এবং ইবাদাত সমূহ উত্তম নাকি কোন বড় আলেমের দেখিয়ে দেয়া পদ্ধতি এবং ইবাদাত সমূহ উত্তম???

-নিঃসন্দেহে রাসুল (সাঃ)-এর দেখিয়ে দেয়া পদ্ধতি-ই এবং ইবাদাত সমূহ-ই উত্তম হবে।

অতএব কেউ যদি আর রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর রাসুল (সাঃ)-এর দেখিয়ে দেয়া পদ্ধতি এবং ইবাদাত সমূহকে উত্তম মনে না করে, বর্তমান যুগের আলেমদের দেখিয়ে দেয়া পদ্ধতি এবং ইবাদাত সমূহকে উত্তম মনে করে তবে উপরের হাদিস অনুযায়ী সেই ব্যক্তি আর রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর উম্মত-ই থাকবে না।

তাহলে যে, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর উম্মত-ই থাকবে না, কিয়ামতের দিন তার সুপারিশের কি অবস্থা হবে? তাকে কি আল্লাহ্‌ ক্ষমা করবেন?

এবার আসুন বিদআত সমূহ চিহ্নিত করার চেষ্টা করিঃ
দ্বীনের মধ্যে বিদআত মূলত দু’প্রকার।
(১) বিশ্বাসের ক্ষেত্রে বিদআত
(২) আমলের ক্ষেত্রে বিদআত।

বিশ্বাসের ক্ষেত্রে বিদআতঃ ইসলামের মূল ভিত্তি হচ্ছে ঈমান, তথা বিশ্বাস। যে যে বিষয়য়ের উপর বিশ্বাস স্থাপন করতে হয় সেই সব জিনিষের সাথে যদি আরো নতুন নতুন বিষয় বিশ্বাস করা হয় তবে সেটাই হবে বিশ্বাসের ক্ষেত্রে বিদআত। বিশ্বাসের ক্ষেত্রে বিদআত হচ্ছে ঐ সমস্ত বিদআত যে গুলো নাবী (সাঃ) ঈমান আনার জন্য বিশ্বাস করতে বলেন নি, যে সকল বিশ্বাস সাহাবায়ে কেরাম করতেন না। যেমনঃ আল্লাহ্‌ নিরাকার, আল্লাহ্‌ সর্বাস্থানে বিরাজমান, নাবী (সাঃ) নূরের তৈরী, নাবী (সাঃ)-কে সৃষ্টি না করলে কিছুই আল্লাহ্‌ সৃষ্টি করতেন না ইত্যাদি সব-ই বাতিল আকীদা সমূহ। এই ধরণের নতুন নতুন আকিদাই হচ্ছে- বিশ্বাসের ক্ষেত্রে বিদআত।

আমলের ক্ষেত্রে বিদআতঃ যেহেতু বিদআত মানেই হচ্ছে এই শরিয়াতে নতুন নতুন আবিষ্কার করা তাই আমলের ক্ষেত্রেও নাবী (সাঃ) যে সলক আমল করতে নির্দেশ দেননি, সাহাবায়ে কেরামগণ যে সকল আমল করেন নি বা করতেন না, বর্তমান যুগের সেই সমস্ত আমলই বিদআতের অন্তর্ভুক্ত।
এটা আবার কয়েক প্রকার হয়ে থাকে। যেমনঃ- (১) নতুন কোন ইবাদত আবিষ্কার করা, (২) শরীয়ত সম্মত ইবাদতের মধ্যে বৃদ্ধি করা, (৩) যেকোন একটি ইবাদত রাসুল (সাঃ) এর পন্থায় আদায় না করে নতুন, বিদআতী নিয়মে পালন করা এবং (৪) শরীয়ত সম্মত ইবাদতকে সময়ের সাথে সংশ্লিষ্ট করা, যা শরীয়তে নির্ধারিত নয়।

নতুন ইবাদত আবিষ্কার করা ইসলামী শরীয়তের সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কেননা মহান আল্লাহ্‌ বলেন-
"আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দ্বীনকে পূর্নাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অবদান সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্যে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম। (সুরা আল মাইদাঃ ৩)

উক্ত আয়াত থেকে বুঝা যায় যে- দ্বীন পূর্ণাঙ্গ। পূর্ণাঙ্গ কোন জিনিষের ভিতরে নতুন করে কিছু ঢোকানোর থাকে না। একটি গ্লাসে যদি পানি পরিপূর্ণ থাকে তবে সেখানে কি নতুন করে পানি দেয়া যাবে?

আল্লাহ্‌র দ্বীন পরিপূর্ণ। কেউ যদি এই দ্বীনের মধ্যে নতুন ইবাদাত সংযুক্ত করে তবে সে যেন মনে করছে দ্বীন পরিপূর্ণ নয়, দ্বীনের মধ্যে আরো কিছু বাকী আছে। এজন্যই যে ব্যক্তি দ্বীনের মধ্যে নতুন ইবাদাতের অবতারণা করল সে মূলত আল্লাহ্‌কে অপমানিত করল।

মহান আল্লাহ্‌ বলেন-
হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, রাসূলের (সাঃ) আনুগত্য কর এবং নিজেদের কর্ম বিনষ্ট করো না। (সুরা মুহাম্মাদঃ ৩৩)

তাই আল্লাহ্‌ যা বলেছেন ঠিক তাই করতে হবে, রাসূল (সাঃ) যা বলেছেন ঠিক তাই করতে হবে, এর উল্টা-পাল্টা করলে কোন আমল তো কবুল হবেই না বরং তা বিনষ্ট হয়ে যাবে, উক্ত আয়াতে মহান আল্লাহ্‌ একথাই বলেছেন।

মহান আল্লাহ্‌ আরো বলেন-
"মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ ও রসূলের চেয়ে আগে বাড়িও না এবং আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছু শুনেন ও জানেন। (সুরা হুজুরাতঃ ১)

তাই আমাদের কখনোই উচিৎ হবে না রাসুল যা দিয়েছেন তা বর্জন করে নিজে নতুন কিছুর অবলম্বন করা। রাসুল যা করেছেন তার চেয়ে আগে বেড়ে যাওয়া।

রাসুলে পদ্ধতি বাদ দিয়ে ইবাদাত করলে তা গ্রহনযোগ্য হবে না। বুক ফাটিয়ে কান্না-কাটি করে ইবাদাত করলেও তা কবুল হবে না।

নাবী (সাঃ) বলেন-
“যে ব্যক্তি এমন আমল করবে যার ব্যাপারে আমার শরীতের নির্দেশনা নেই, উহা প্রত্যাখ্যাত।” (মুসলিম হা/৩২৪৩)

তাই আমাদেরকে রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর পদ্ধতিতেই ফিরে আসতে হবে, উনার পদ্ধতিই যে আলেমের চেয়ে সর্বশ্রেষ্ঠ।
মহান আল্লাহ্‌ বলেন-
"যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্যে রসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম নমুনা রয়েছে। (সুরা আল আহযাবঃ ২১)

উল্লেখ্য যে, বিদআত হচ্ছে সেটাই যেটাকে দ্বীনের অংশ মনে করে করা হয় এবং নেকীর আশায় করা হয়।

বিদআতের কতিপয় উদাহরণঃ
যেমন কোন ব্যক্তি আছর কিংবা যোহরের নামায এক রাকাত বাড়িয়ে অথবা কমিয়ে আদায় করল।
শরীয়ত সম্মত ইবাদাত বিদআতী নিয়মে পালন করা। যেমন হাদীছে বর্ণিত জিকিরের বাক্যগুলি দলবদ্ধভাবে সংগীতাকারে। উচ্চৈঃস্বরে পাঠ করা। কিংবা ইবাদত পালনে নফসের উপর এমন কষ্ট দেয়া, যা রাসূল (সাঃ)এর সুন্নাতের বিরোধী।
শরীয়ত সম্মত ইবাদতকে এমন সময়ের সাথে নির্দিষ্ট করে আদায় করা, যা শরীয়ত নির্ধারণ করেনি। যেমন, শাবান মাসের ১৫ তারিখ দিনের বেলা রোজা রাখা এবং রাতে নির্দিষ্ট নামায আদায় করা। মূলতঃ রোজা ও নামায শরীয়ত সম্মত ইবাদত। কিন্তু ইহাকে নির্দিষ্ট সময়ের সাথে খাছ করার কোন দলীল নেই।
রোজা নির্দিষ্ট মাস এবং নামায নির্দিষ্ট সময়ের সাথে সংশ্লিষ্ট। প্রতিটি ইবাদত তার নির্ধারিত সময়ে আদায় করতে হবে। কিন্তু শাবান মাসের ১৫ তারিখে শব-ই-বরাত নাম দিয়ে দিনের বেলা রোজা রাখা এবং সারা রাত নফল নামায আদায় করা নিশ্চিতভাবে বিদআত। কারণ এ সম্পর্কে কোন সহীহ দলীল নেই।

বিদআত সম্পর্কে আমাদের মাঝে অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। বিদআত জিনিষটা যে আসলে কি তা অধিকাংশ মুসলিমরা-ই বুঝে না। এমন অনেক আলেম-ওলামাও বিদআতের সঠিক দিক-নির্দেশনাই বুঝতে ভুল করে। কোন কোন বিষয় গুলো বিদআতের অন্তর্ভুক্ত হবে আর কোন কোন বিষয় গুলো বিদআতের অন্তর্ভুক্ত হবে না, এই বিষয়টি বুঝতে না পারার কারনে তারা এখতেলাফ করতে শুরু করে যে- এটা বিদআত হলে ওটা বিদআত হবে না কেন?  এটা বিদআত হলে সেটা বিদআত হবে না কেন ইত্যাদি ইত্যাদি?
তাই বিদআত আসলে কোনটা তা চিহ্নিত করার যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। বিদআত হচ্ছে সে আমলটাই যার কোন দলিল কুরআন ও সহিহ হাদিসে নেই, কুরআন ও সহিহ হাদিসে না থাকার পরও যদি কেউ কোন আমল করে তবে সেটাই হবে বিদআত।

উদাহরণ স্বরূপ, কুরআন ও হাদিসে দৈনিক ১০ ওয়াক্ত সালাতের কথা কোত্থাও নেই, এখন যদি কেউ দৈনিক ১০ ওয়াক্ত সালাতের প্রচলন করে তবে সে বিদআত করল।  আরো যেমন, কেউ যদি খতমে ইউনুস করে তবে সে বিদআত করল। কেননা এই আমলের কথা কুরআন ও হাদিসের কোত্থাও নেই। নাবী (সাঃ) এমন আমলের কথা কখনো বলেন নি।  মৃতের জন্য সুরা ফাতেহা ও সুরা ইখলাস, সুরা ইয়াসিন পাঠ করে নেকি পৌঁছানো। কেননা এমন কথাও কুরআন ও হাদিসের কোত্থাও নেই।
অনেক সময় কাউকে যদি বলা হয় যে এই জিনিষটা বিদআত, তখন সে প্রশ্ন করে এটা যে বিদআত এমন কথা   কুরআন-হাদিসের??

-এটি বোকার মত প্রশ্ন। আমি পূর্বেই বলেছি, বিদআত হচ্ছে সে আমলটাই যার কোন দলিল কুরআন ও সহিহ হাদিসে নেই, কুরআন ও সহিহ হাদিসে না থাকার পরও যদি কেউ কোন আমল করে তবে সেটাই হবে বিদআত। তাই ঐ সব আমল কুরআন-হাদিসে আসবে কোত্থেকে? 



দ্বীনের মধ্যে বিদআতের বিধানঃ
দ্বীনের ব্যাপারে সকল প্রকার বিদআতই হারাম ও গোমরাহী। কেননা রাসূল (সাঃ) বলেছেন,

وَإِيَّاكُمْ وَمُحْدَثَاتِ الْأُمُورِ فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلَالَة

অর্থঃ তোমরা দ্বীনের মাঝে নতুন বিষয় আবিষ্কার করা থেকে বিরত থাকবে, কেননা প্রত্যেক নতুন বিষয়ই বিদআত। আর প্রতিটি বিদআতের পরিণাম গোমরাহী বা ভ্রষ্টতা।

উপরের হাদীছগুলোর মাধ্যমে এটাই প্রমাণিত হয় যে, দ্বীনের মধ্যে প্রতিটি নতুন বিষয়ই বিদআত। আর প্রতিটি বিদআতই হারাম ও গোমরাহী। তবে এ হারাম বিদআতের প্রকারভেদ অনুযায়ী বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। বিদআতের কিছু কিছু প্রকার প্রকাশ্য কুফরীরই নামান্তর। যেমন কবরবাসীদের নৈকট্য হাসিলের উদ্দেশ্যে কবরের চতুর্দিকে কাবা ঘরের তাওয়াফের ন্যায় তাওয়াফ করা, কবরের উদ্দেশ্যে পশু যবাই করা, নযর-মান্নত পেশ করা, কবরবাসীর কাছে দু’আ করা, তাদের কাছে আশ্রয় চাওয়া ইত্যাদি। এমন কিছু বিদআতও রয়েছে, যা শির্ক না হলেও মানুষকে শির্কের দিকে নিয়ে যায়। যেমন কবরের উপর গম্বুজ তৈরী করা, কবর উঁচু করা, পাকা করা, কবরের উপর লিখা, কবরের কাছে নামায আদায় করা, দু’আ করা ইত্যাদি।


একটি সতর্কতাঃ
আমাদের দেশের কিছু কিছু বিদআতি আলেম বিদআতকে জায়েজ করার জন্য বিদাতে হাসানা এবং বিদাতে সাইয়েআ এদু’ভাগে ভাগ করে থাকে। বিদআতকে এভাবে ভাগ করা সম্পূর্ণ ভুল এবং রাসূল (সাঃ)এর হাদীছের সম্পূর্ণ বিপরীত। রাসূল (সাঃ) বলেছেন, প্রতিটি বিদআতই গোমরাহী বা ভ্রষ্টতা।
আর এই শ্রেণীর আলেমগণ বলে থাকে, প্রত্যেক বিদআত গোমরাহী নয়। বরং এমন কিছু বিদআত রয়েছে, যা হাসানা বা উত্তম বিদআত।

আল্লাহ্‌র রাসুল (সাঃ) বলছেন- “প্রত্যেক বিদআতই গোমরাহী”

এখানে আল্লাহ্‌র রাসুল (সাঃ) প্রত্যেক বলেছেন, কতিপয় বলেন নি।

সুতরাং বিদআতে হাসানার পক্ষে মত প্রকাশকারীদের কোন দলীল নেই। কিছু লোক তারাবীর নামাযের ব্যাপারে উমার (রাঃ) এর উক্তি “এটি কতই না উত্তম বিদআত ” এ কথাটিকে দলীল হিসাবে গ্রহণ করে থাকে। তারা আরও বলেন, এমন অনেক বিদআত আবিষ্কৃত হয়েছে, যা সালাফে সালেহীনগণ সমর্থন করেছেন। যেমন গ্রন্থাকারে কুরআন একত্রিত করণ, হাদীছ সঙ্কলন করণ ইত্যাদি।

উপরোক্ত যুক্তির উত্তর এই যে, শরীয়তের ভিতরে এ বিষয়গুলোর মূল ভিত্তি রয়েছে। এগুলো নতুন কোন বিষয় নয়। উমার (রাঃ) এর কথা, “এটি একটি উত্তম বিদআত”, এর দ্বারা তিনি বিদআতের শাব্দিক অর্থ গ্রহণ করেছেন। ইসলামের পরিভাষায় যাকে বিদআত বলা হয়, সে অর্থ গ্রহণ করেন নি। মৌলিকভাবে ইসলামী শরীয়তে যে বিষয়ের অস্তিত্ব রয়েছে, তাকে বিদআত বলা হয়নি। এমন বিষয়কে যদি বিদআত বলা হয়, তার অর্থ দাড়ায় জিনিষটি শাব্দিক অর্থে বিদআত, পারিভাষিক অর্থে বিদআত নয়। সুতরাং শরীয়তের পরিভাষায় এমন বিষয়কে বিদআত বলা হয়, যার পক্ষে কোন দলীল-প্রমাণ নেই।

অর্থাৎ দুনিয়ার ক্ষেত্রে যদি কেউ নতুন কোন কাজ করে যা রাসুল (সাঃ) এর যুগে ছিল না সেটি শাব্দিক অর্থে বিদআত হলেও শরিয়াতগত পরিভাষায় নয়। যেমন রাসুল (সাঃ) মোবাইল ব্যাবহার করেন নি, তাহলে কি মোবাইল ব্যাবহার করা বিদআত?
রাসুল (সাঃ) উটে ছড়েছেন, কিন্তু আমরা বাস, ট্রেন, বিমান ইত্যাদিতে চড়ি তাহলে কি এগুলোতে চড়া কি বিদআত?

-জী না এগুলো বিদআত নয়। কেননা বিদআত হচ্ছে সেটাই যেটাকে দ্বীনের অংশ মনে করে করা হয় এবং নেকীর আশায় করা হয়। দুনিয়া এবং দ্বীন ভিন্ন জিনিষ। দুনিয়ার ক্ষেত্রে কেউ নতুন নতুন জিনিষ আবিষ্কার করলে বা ব্যাবহার করলে সেটা শাব্দিক অর্থে বিদআত হলেও শরিয়াতগত পরিভাষায় বিদআত নয়।
কেননা রাসুল (সাঃ) বলেছেন- নিকৃষ্ট কাজ হচ্ছে শরীয়াতে নতুন কিছু সৃষ্টি করা।  (মুসলিমঃ ৭৬৮)

তাই মাইকে আযান দেয়া, ফেসবুক ব্যাবহার করা ইত্যাদি এগুলো বিদআত নয়।

আর গ্রন্থাকারে কুরআন সংকলনের পক্ষে দলীল রয়েছে। নবী (সাঃ) কুরআনের আয়াতসমূহ লিখার আদেশ দিয়েছেন। তবে এই লিখাগুলো একস্থানে একত্রিত অবস্থায় ছিলনা। তা ছিল বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্ন অবস্থায়  সাহাবাগণ তা এক গ্রন্থে একত্রিত করেছেন। যাতে কুরআনের যথাযথ হেফাযত করা সম্ভব হয়।

তারাবীর নামাযের ব্যাপারে সঠিক কথা হলো, রাসূল (সাঃ) তাঁর সাহাবাদেরকে নিয়ে জামাতবদ্বভাবে কয়েকরাত পর্যন্ত তারাবীর নামায আদায় করেছেন। ফরজ হয়ে যাওয়ার ভয়ে পরবর্তীতে ছেড়ে দিয়েছেন। আর সাহাবাগণের প্রত্যেকেই রাসূল (সাঃ) এর জীবিতাবস্থায়ও মৃত্যুর পর একাকী এ নামায আদায় করেছেন। পরবর্তীতে উমার (রাঃ) সবাইকে এক ইমামের পিছনে একত্রিত করেছেন, যেমনিভাবে তাঁরা রাসূল (সাঃ) এর পিছনে তাঁর ইমামতিতে এ নামায আদায় করতেন। তাই ইহা বিদআত নয়।

হাদীছ লিখিতভাবে সংরক্ষণের ব্যাপারেও দলীল রয়েছে। রাসূল (সাঃ) কতিপয় সাহাবীর জন্য তাঁদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাদীছ লিখে দেয়ার আদেশ দিয়েছেন। বিদায় হজ্জের ভাষণ দেয়ার পর আবু শাহ নামক জনৈক সাহাবী রাসূল (সাঃ) এর কাছে ভাষণটি লিখে দেয়ার আবেদন করলে রাসূল (সাঃ) বলেছেন, اكتبوا لأبى شاه)) অর্থাৎ আবু শাহের জন্য আমার আজকের ভাষণটি লিখে দাও। তবে রাসূল (সাঃ)এর যুগে সুনির্দিষ্ট কারণে ব্যাপকভাবে হাদীছ লিখা নিষেধ ছিল। যাতে করে কুরআনের সাথে হাদীছ মিশ্রিত না হয়ে যায়। পরবর্তীতে যখন রাসূল (সাঃ) ইনে-কাল করলেন এবং কুরআনের সাথে হাদীছ মিশ্রিত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দূরিভুত হলো, তখন মুসলমানগণ হাদীছ সংরক্ষণ করে রাখার জন্য তা লিখার কাজে আত্মনিয়োগ করলেন। যারা এ মহান কাজে আঞ্জাম দিয়েছেন, তাদেরকে আল্লাহ তায়া’লা উত্তম বিনিময় দান করুন। কারণ তারা আল্লাহর কিতাব এবং নবী (সাঃ)এর সুন্নাতকে বিলুপ্তির আশংকা থেকে হেফাজত করেছেন।


বিদআতের কু প্রভাবঃ
১. সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে- বিদআতি ব্যক্তির তওবা নসীব হয় না, কেননা সে তো এটা নেকি মনে করে করছে। চোরের মনে এক সময় অনুশোচনা আসে, মদখরের মনে এক সময় অনুশোচনা আসে কিন্তু বিদআতি ব্যক্তির মনে অনুশোচনা আসে না।

২. বিদ’আত ইসলামী লোকদের মাঝে দুশমনী , ঘৃণা , বিভেদ ও বিভক্তি সৃষ্টি করে। মহান আল্লাহ্‌ বলেন : “নিশ্চয় এটিই আমার সোজা সরল পথ তোমরা তারই অনুসরণ কর , তোমরা বহু পথের অনুসরণ করো না , কারণ তা তোমাদেরকে তাঁর এক পথ হতে বিচ্ছিন্ন করে দিবে” – সূরা আন’আম : ১৫৩ ।

৩. বিদ’আত সহীহ সুন্নাহকে বিতাড়িত করে তার স্থলাভিষিক্ত হয়। বাস্তব নমুনায় এর বিরাট প্রমাণ রয়েছে। যেমন ফরজ সালাত শেষে কিছু সুন্নাতি যিকর, দুয়া রয়েছে। কিন্তু জামা’বদ্ধ হয়ে হাত তুলে দো’আ করলে , সালাতের পরে পঠিতব্য সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত দো’আ ও যিকিরগুলো পড়া হয় না । অতএব বিদআত করলে সহীহ সুন্নাহ বিতাড়িত হবেই।

৪. যারা বিদআত করে তারা সর্বদা আল্লাহ্‌ থেকে গাফেল থাকে এবং জান্নাতের জন্য শর্টকাট খুঁজে। যেমন, যারা নিয়মিত ৫ ওয়াক্ত সালাত আদায় করে না তারা জুম্মার দিনে মুনাজাত দ্বারা পার পেতে চায়। যারা সারা বছর ফরজ ইবাদাত করে না, তারা শব-ই-বরাতের মত বিদআত তৈরি করে শর্টকাটে জান্নাত পেতে চায়।

৫. সুন্নাতকে ঘৃণা করে বিদআত করলে ফিতনায় পরে যাওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। মহান আল্লাহ্‌ বলেন-
“যারা রাসুলের নির্দেশের বিরোধীতা করবে তারা যেন সতর্ক হয় তাদেরকে ফিতনা পেয়ে বসবে বা তাদেরকে পীড়াদায়ক শাস্তি দ্বারা গ্রাস করা হবে।” (সূরা আন-নূর : ৬৩)

৬. যারা সহিহ সুন্নাহর উপর আমল করে তাদেরকে বিদআতিরা গালি-গালাজ করে।


বিদআতের পরিনামঃ
উপরোক্ত আলচনায় এটা স্পষ্ট যে, বিদআত করা সম্পূর্ণ হারাম। বিদআতের পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ। বিদআত করলে ইবাদাত কবুল হয় না। বিদআতের শেষ পরিণাম জাহান্নাম।

বিদআত করলে কিয়ামতের দিন যখন সূর্য মাথা অতি নিকটে থাকবে তখন সকলে তৃষ্ণায় পানি পান করতে চাইবে, আর তখন রাসুলুল্লাহ (সাঃ) তার উম্মতকে হাউজে কাউসার  থেকে পানি পান করাবেন। কিন্তু আফসোস বিদআতিরা সেই দিন পানি পান করতে পারবে না।

আবু হাসেম হতে বর্ণিত , তিনি বলেন আমি সাহালকে বলতে শুনেছি তিনি রাসূল (সাঃ) কে বলতে শুনেছেন , “আমি তোমাদের পূর্বেই হাওযে কাওসারের নিকট পৌঁছে যাব । যে ব্যক্তি সেখানে নামবে এবং তার পানি পান করবে সে আর কখনও পিপাসিত হবে না । কতিপয় লোক আমার নিকট আসতে চাইবে , আমি তাদেরকে চিনি আর তারাও আমাকে চেনে । অতঃপর আমার ও তাদের মধ্যে পর্দা পড়ে যাবে । রাসূল (সাঃ) বলবেন : তারা তো আমার উম্মাতের অন্তর্ভুক্ত । তাকে বলা হবে আপনি জানেন না আপনার পরে তারা কি আমল করেছে । তখন যে ব্যক্তি আমার পরে (দ্বীনকে) পরিবর্তন করেছে তাকে আমি বলবো : দূর হয়ে যা , দূর হয়ে যা” (সহীহ মুসলিম হা/৪২৪৩)।

এর চেয়ে বড় অপমান আর কি হতে পারে???

বিদআতের কারনে জাহান্নাম অবধারিত-
রাসূল (সাঃ) বলেছেন : ‘সব বিদ’আতই ভ্রষ্টতা, আর প্রত্যেক ভ্রষ্টতার পরিনাম-ই হচ্ছে জাহান্নাম। (আবু দাউদ)

                    ----------------------------------------------------------------------------------

                         '' শুধু নিজে শিক্ষিত হলে হবেনা, প্রথমে বিবেকটাকে শিক্ষিত করুন। ''

ফিতনার সময় করণীয় কি???

fitna
আলিফ লাম মীম। মানুষ কি মনে করে, ‘আমরা ঈমান এনেছি’ বললেই ওদের ফিতনা (পরীক্ষা)  ছাড়াই ছেড়ে দেওয়া হবে? ওদের পূর্ববর্তীদেরকেও পরীক্ষা করা হয়েছিলো। অবশ্যই আল্লাহ্‌ স্পষ্ট করে দেবেন কারা সত্যবাদী ও কারা মিথ্যাবাদী। – (সূরা আনকাবুত ২৯:১-৩)
নিচের ঘটনাগুলোর কথা ভেবে দেখুন:
  • হঠাৎ করেই বিশাল এক বিল্ডিং ধ্বসে পড়েছে আপনার শহরে। ধ্বংসস্তুপের নিচে চাপা পড়া মুখগুলোর ছবি দেখে আপনি ঘুমাতে পারছেন না। মনের ভিতরের ছটফটানিটা যেন কিছুতেই থামছে না। নিজেকে বার বার প্রশ্ন করছেন – এদের জন্য আমি কি করতে পারি?
  • দেশজুড়ে ‘অমুক’ ইস্যু নিয়ে মাঠ গরম হয়ে গেছে। আপনার বন্ধুরা, পাড়ার বড় ভাইয়েরা দলে দলে যোগ দিচ্ছেন ‘তমুক চত্বরে’। আপনিও ভাবছেন – আমিও ওদের সাথে যাবো নাকি? আবার ভাবছেন – এদের সাথে গেলে তো আমার অন্য সার্কেলের বন্ধুরা আমাকে খারাপ বলবে। কি যে করি, কি যে করি, ফেইসবুকে একটা রক্তগরম স্ট্যাটাস দিয়ে দিবো নাকি? কিছুতেই আপনি বুঝে উঠতে পারছেন না কি করবেন!
  • শুরু হয়েছে বিশ্বকাপ ক্রিকেট প্রতিযোগিতা। গত কয়েক বছরে ক্রিকেটে  আপনার দেশ ভালো খেলায় এটাই এখন জাতীয় সিম্বল। আড্ডায়, টিভিতে, সংবাদপত্রে, ফেইসবুকে – যেখানেই যান শুধু ক্রিকেট নিয়ে আলোচনা। ক্রিকেটের নেশায় বুঁদ হয়ে আছে পুরো জাতি। আর এর মধ্যে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলাটা পড়েছে কিনা ঠিক জুম’আর সময়! খেলা দেখলে জুম’আ মিস, জুম’আ পড়তে গেলে খেলা দেখা মিস। বড় মুসিবতে পড়া গেলো! কি যে করি!
  • এসেছে রামাদান মাস। আপনি ভাবলেন রামাদান উপলক্ষে ফেসবুকের ইসলামী লেখাগুলি একটু পড়ে দেখি। পড়তে যেয়ে দেখলেন – আপনার “ইসলামী মাইন্ডেড” বন্ধুরা যতটা রামাদানের করনীয়-বর্জনীয় আর ফজীলত সম্পর্কে লিখছে, তার চেয়ে ঢের বেশী মারামারি করছে তারাবীর নামাজ ৮ রাকআত না ২০ রাকআত নিয়ে। এই পক্ষ ইট মারে তো অন্য পক্ষ হাতবোমা মারে। এই লেখাগুলি পড়তে যা মজা! কিসের কি রামাদানের ফজিলত, আপনি মজে গেলেন মাজহাবী বিতর্কে।
উপরে যে ঘটনাগুলো বলা হলো তার সবগুলিতে একটা ব্যাপার কমন – এগুলো সবই “ফিতনা”-র উদাহরণ। ফিতনা (trials and tribulations) মানব ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশেষত: আমরা এখন যে সময়ে বাস করছি তাতে পারিবারিক, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় ফিতনা প্রায়শ:ই চরম আকার ধারণ করে। দেশে বলুন, দেশের বাইরে বলুন সর্বত্র মানুষের মধ্যে ব্যাপক মতপার্থক্য যা হঠাৎ করেই রূপ নেয় ঝগড়ায়, ঘৃণায়, খুনাখুনিতে।  ফিতনা যখন চরম আকার ধারণ করে তখন ভালো-মন্দের পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ে, আর এই সময়ে অনেকেই কনফিউজড হয়ে পড়ে যে, আমার কি করনীয়? ফিতনার সময় একজন প্রকৃত মুসলিমের দায়িত্ব কি  – এই সমন্ধে কোরআন আর হাদিস কি বলে – এই লেখায় আমি তার একটা জেনারেল গাইডলাইন খোঁজার চেষ্টা করেছি।
লেখাটি পড়ার সময় অবশ্যই মনে রাখতে হবে: এটা শুধুই একটা জেনারেল গাইডলাইন। কোনো সমাজ বা দেশ ফিতনাগ্রস্ত হলে সেখানকার মুসলিমদের স্পেসিফিক দায়িত্ব কি হবে – তা শুধু সেই সমাজের/দেশের যোগ্যতাসম্পন্ন ইসলামি স্কলারেরাই বলতে পারবেন।
ফিতনা কাকে বলে?
ফিতনা শব্দের অর্থ হলো ‘পরিশুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে পরীক্ষা করা’ (to examine with the intent of purifying)। এই পরীক্ষা আমাদের প্রিয় কোনও কিছু (যেমন অর্থ, সম্পদ, ক্ষমতা, পুরুষের জন্য নারী / নারীর জন্য পুরুষ) দিয়ে হতে পারে, আবার হতে পারে আমাদের অপছন্দনীয় কিছু দিয়ে (যেমন অকস্মাৎ বিপদ, গৃহযুদ্ধ, বিশৃংখলা, অত্যাচারী শাসক ইত্যাদি)। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা ফিতনার মাধ্যমে তাঁর কৃতজ্ঞ বান্দাদেরকে অকৃতজ্ঞ মানুষ থেকে পৃথক করেন।
সাধারণ মানুষের ধারণা ফিতনা মানেই বুঝি খারাপ কিছু। ধারণাটা ঠিক না। আল্লাহ্‌ তা’লা কুরআনে সন্তান ও সম্পদকে ফিতনা বলেছেন (http://quran.com/8/28), অথচ আমরা এগুলোকে ভালো কিছু বলেই জানি। কাজেই, কোন কিছু ফিতনা কিনা তা নির্ধারন করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।  চলমান কোন ঘটনা ফিতনা কিনা তা ভালো বলতে পারবেন ঐ সময়ের ও ঐ এলাকার ইসলামী স্কলারেরা। কিন্তু, যে কোনও ফিতনারই দুইটি কমন বৈশিষ্ট্য থাকে [১,১০]। এগুলো হলো –
১) ফিতনা প্রচন্ড আকর্ষণের সৃষ্টি করে: যে কোন ফিতনাই মানুষকে চুম্বকের মতো টানে। যে লোক কোনদিন খবরের কাগজ পড়ে না, ফিতনার সময় সেও সবাইকে জিজ্ঞেস করে – আচ্ছা এর পর কি হয়েছিলো? বর্তমান যুগে ফিতনা চেনার একটা সহজ উপায় হলো ফেইসবুক। যখন যে ফিতনা শুরু হয়, ফেইসবুকের হোম পেইজ আর প্রোফাইল পিকচার ভরে যায় ঐ ফিতনায়।
) ফিতনা মানুষকে আল্লাহর ইবাদত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়: কিছু কিছু ফিতনা আছে যেগুলোর উপস্থিতিতে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও প্রতিকূল পরিবেশের কারণে মানুষের পক্ষে আল্লাহর ইবাদত করা কঠিন হয়ে পড়ে (যেমন – যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ )। অন্যদিকে কিছু কিছু ফিতনা আছে (যেমন – বিশ্বকাপ খেলা) যেগুলোতে মানুষ এতটাই আচ্ছন্ন হয়ে যায় যে, সে ভুলে যায় তার উপর তার প্রতিপালকের দেয়া দায়িত্ব। নামাজী ব্যক্তি ফিতনার আকর্ষণে সময় মতো নামাজ পড়তে পারে না, মা-বাবা ও পরিবারের উপর দায়িত্বের কথা ভুলে গিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে ফিতনার আপডেট জানার জন্য। ফিতনার সময় গিবত বেড়ে যায়, বেড়ে যায় মিথ্যাবাদীতা, চোগলখুরী আর কাঁদা ছোড়াছুড়ি।
ফিতনার জবাবে করণীয় কাজগুলোকে আমি দুইভাগে ভাগ করেছি: আত্মিক (spiritual) ও পার্থিব (worldly)। আত্মিক কাজগুলো পার্থিব কাজগুলোর ভিত্তি, যদিও দুই ভাগের কাজগুলোই গুরুত্বপূর্ন।
আত্মিক / Spiritual যে কাজগুলো করতে হবে: 
attik
১ – বিপদগ্রস্ত মানুষের জন্য কষ্ট অনুভব করা: ফিতনা তার সাথে করে নিয়ে আসে বিপদ আর কষ্ট, সর্বনিম্ন আমরা যা করতে পারি তা হলো ফিতনায় পড়া মানুষের জন্য কষ্ট অনুভব করা। ফিতনায় পড়া কষ্ট পড়া মানুষগুলো যদি মুসলিম হয়, তাহলে তাদের জন্য কষ্ট অনুভব করা আমাদের ঈমানের অংশ। যখন বাংলাদেশ, ফিলিস্তিন, গুয়ানতানামো, সিরিয়া, মিশর, ইরাক, আফগানিস্তান, ভারত, পাকিস্তান বা বার্মার মুসলিমরা ফিতনায় পড়ে, তখন যদি আমরা বিন্দুমাত্র কষ্ট অনুভব না করে নিজের স্বাভাবিক জীবনকার্য চালিয়ে যেতে পারি, তাহলে বুঝে নিতে হবে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে প্রশ্ন করার সময় এসেছে – আমরা কি আসলেই মুসলিম?
সকল ঈমানদারেরা তো পরষ্পর ভাই ভাই। (সূরা হুজুরাত ৪৯:১০ আয়াতাংশ)
তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবেনা যদি ঈমানদার না হও, তোমরা ঈমানদার হতে পারবে না যদি একজন আরেকজনকে ভালো না বাসো। (মুসলিম)
তুমি ততক্ষণ পর্যন্ত ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না তোমার ভায়ের জন্য তা-ই ভালোবাসো যা তুমি তোমার নিজের জন্য ভালোবাসো। – (বুখারী)
২ –  দু’আ করা: বর্তমান সময়ে দু’আ করাকে আমরা খুব তুচ্ছ একটা ব্যাপারে মনে করি। আমরা মনে করি, ধূর! দু’আ করে কি হবে? আসলে এর মাধ্যমে আমরা আমাদের ঈমানী দৈন্যতাই প্রকাশ করি। আমরা যে আল্লাহর সর্বময় ক্ষমতায় বিশ্বাস করি না তা-ই প্রমাণ করি। অথচ, দু’আ হচ্ছে মু’মিনের অস্ত্র।  একজন মুসলিম বিশ্বাস করে যে আল্লাহ সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী, সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ সর্ব সময় শুধু তাঁর কাছেই আছে। তাই একজন মুসলিম বড় বড় ব্যাপার থেকে শুরু করে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ব্যাপারেও আল্লাহর কাছে দু’আ করে – একগ্লাস পানি খাওয়ার জন্য হাতটা যেমনি আগে বাড়ায়, তেমনি বিসমিল্লাহ বলে আল্লাহর সর্বময় ক্ষমতাকেও স্বীকার করে। সে ফিতনার আগে দু’আ করে, ফিতনার সময় দু’আ করে, ফিতনার পরেও দু’আ করে। আমরা দু’আ করবো ফিতনায় না পড়ার জন্য, আর দু’আ করবো ফিতনার সময় যাতে মনোযোগ না হারিয়ে একাগ্রচিত্তে আল্লাহর ইবাদত করতে পারি। আমরা দু’আ করবো অত্যাচারীতের জন্য যেন সে অত্যাচার থেকে মুক্তি পায়, এমনকি দু’আ করবো অত্যাচারীর জন্য যাতে সে অত্যাচারের পথ ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করে।
তোমার রব বলেন: আমাকে ডাকো, আমি উত্তর দিবো। – (সূরা গাফির ৪০:৬০ আয়াতাংশ)
আমিই মানুষকে সৃষ্টি করেছি এবং আমি জানি তার মন তাকে কি কুমন্ত্রণা দেয়। আমি (আমার জ্ঞানের মাধ্যমে) তার গ্রীবাস্থিত ধমনীর চেয়েও নিকটতর । – সূরা কফ ৫০:১৬
রাসূলুল্লাহ(সা) বলেন: তোমরা আল্লাহর কাছে প্রকাশ্য ও গোপন ফিতনা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করো। – (সহীহ মুসলিম)
৩ –  ইসলামের উপর অবিচল থাকা: ফিতনার সময় শয়তান এসে মানুষকে বলে – ‘দেখো, আজ ইসলাম ধর্মের কারণেই পৃথিবীতে এত সমস্যা। ধর্মের কারণেই এত বিভেদ, মানুষে মানুষে এত মারামারি। আর আল্লাহ্‌ যদি সত্যিই থেকে থাকেন তাহলে এখন তিনি মুসলমানদেরকে সাহায্য করছেন না কেন?’ প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর সাহায্য আসবেই। কিন্তু তার আগে আল্লাহ্‌ ফিতনার মাধ্যমে মানুষের ঈমান পরীক্ষা করবেন, যেভাবে তিনি অত্যাচারী ফেরাউনের মাধ্যমে বনী ইসরাইলের ঈমান পরীক্ষা করেছিলেন, অত্যাচারী কুরাইশবাসীর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ(সা) আর সাহাবীদের ঈমান পরীক্ষা করেছিলেন। ফিতনার সময় যারা মু’মিন তারা ইসলাম থেকে দূরে সরে যায় না, বরং পরীক্ষা যত কঠিন হতে থাকে ইসলামের রজ্জুকে সে তত শক্ত করে আঁকড়ে ধরে, অন্যদিকে মুনাফিকেরা এই সময় মুসলিমদের থেকে পৃথক হয়ে যেয়ে কাফেরদের সাথে হাত মিলায়।
ফিতনা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য নিচের এই দু’আটি রাসূলুল্লাহ(সা) আমাদের শিখিয়ে গেছেন:
dua
উচ্চারন: ইয়া মুক্বাল্লিবাল ক্বুলুব সাব্বিত ক্বালবি ‘আলা দিইনিক
অর্থ: হে হৃদয় পরিবর্তনকারী, আমাদের হৃদয়কে তোমার দ্বীনের উপর সুদৃঢ় করে দাও। – (আহমদ)
৪ –  ইবাদত বৃদ্ধি করা: ফিতনার সময় মানুষের মন বিক্ষিপ্ত থাকে, টেনশন করে, এটা-সেটা চিন্তা করে সে সময় পার করে দেয়। মনের এই অস্থিরতা থেকে মুক্তি পাওয়ার ঔষধ হলো আল্লাহর ইবাদত বৃদ্ধি করা – ধীরে ধীরে সময় নিয়ে নামাজ পড়া, নফল রোজা রাখা, বুঝে বুঝে কোরআন পড়া, স্কলারদের লেকচার শুনা, কোরআনের অর্থ নিয়ে চিন্তা করা।
রাসূলুল্লাহ(সা) বলেন: ফিতনার সময় ইবাদত করা, হিজরত করে আমার কাছে আসার সমতুল্য। (সহীহ মুসলিম)
সাহাবীদের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ মর্যাদাশীল সাহাবীরা হলেন যারা রাসূলুল্লাহ(সা) এর সাথে হিজরত করেছিলেন। আপনার মনে আফসোস আপনি কেন সাহাবা হয়ে জন্মালেন না? সাহাবাদের সমান নেকী অর্জনের সুযোগ আল্লাহ্‌ আপনাকে দিয়েছেন – ফিতনার সময় ধৈর্য্য ধরে আল্লাহর ইবাদত করুন, ইবাদত বৃদ্ধি করুন।
রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন: তোমরা অন্ধকার রাতের টুকরোগুলোর মত (যা ক্রমশই গভীর হতে থাকে) ফিতনা আসার পূর্বে নেকীর কাজ দ্রুত করে ফেল। সেই সময়ে মানুষ সকালে মু’মিন হয়ে ঘুম থেকে উঠবে এবং রাত শুরু করবে কাফের হয়ে, অথবা সে রাত শুরু করবে মু’মিন হয়ে এবং সকালে ঘুম থেকে উঠবে কাফের হয়ে । তখন সে নিজের দ্বীনকে দুনিয়ার সম্পদের বিনিময়ে বিক্রয় করবে। – ( মুসলিম, তিরমিযী, আহমাদ – আবূ হুরাইরাহ(রা) থেকে বর্ণিত)
৫ – ইসলাম নিয়ে পড়াশুনা করা: মুসলমানদের মধ্যে ইসলামের শিক্ষা যত কম থাকবে তত সহজেই তারা ইসলামের শত্রু এবং বিভ্রান্তিকর বক্তব্য প্রদানকারী ইসলামিষ্ট – এই দুই গ্রুপের লোকদের দ্বারা সহজেই মোটিভেটেড হয়ে যাবে। ফলে, ইসলামী শিক্ষায় স্বল্পশিক্ষিত মুসলমানেরা তখন হয় ইসলামের শত্রুদের পক্ষ নিবে, অথবা বিভ্রান্তিকর ইসলামিষ্টদের কথায় আবেগ-তাড়িত হয়ে এমন কিছু করে বসবে যার ফলে সমাজে ফিতনা তো কমবেই না, বরং অস্থিতিশীলতা আরো বৃদ্ধি পাবে।
রাসূলুল্লাহ(সা) বলেন: কিয়ামত যখন কাছে চলে আসবে তখন এমন দিন আসবে যখন (দ্বীনি) জ্ঞান হারিয়ে যাবে, মূর্খতার আবির্ভাব হবে, এবং প্রচুর পরিমাণে মানুষ হত্যা হবে। (ইবনে মাজাহ, বুখারী, মুসলিম, আব্দুল্লাহ(রা) হতে বর্ণিত)
লক্ষ্য করুন, রাসূলুল্লাহ(সা) মানুষ হত্যা বেড়ে যাওয়ার সাথে জ্ঞানের অভাবকে কিভাবে রিলেট করেছেন। মানুষ যত বেশী জ্ঞানবিমুখ হবে, ইসলাম ও দুনিয়া সম্বন্ধে যত কম জানবে, তত সহজেই সুবিধাবাদী গোষ্ঠী তাদের ব্রেইনওয়াশ করে ভুল পথে পরিচালিত করতে পারবে। কাজেই, ফিতনা থেকে বেঁচে থাকতে হলে আমাদের মনোযোগী হতে হবে সিরিয়াস ইসলামী জ্ঞান অর্জনের প্রতি, আলেমদের লেকচার শুনতে হবে, সান্নিধ্যে যেতে হবে, প্রচুর বই পড়তে হবে সাধনা করতে হবে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর। আমাদের দেশে যখনই ইসলাম-বিষয়ক কিছু নিয়ে গন্ডগোল বাধে তখনই দেখা যায় কিছু লোক একটা কোরআন শরীফ হাতে নিয়ে বিভিন্ন আয়াতের নিজের ইচ্ছামতো ব্যাখা দেয়া শুরু করেছে, এদের ইসলাম-বিষয়ক কথা-বার্তা থেকে ১০০ হাত দূরে থাকতে হবে। এই জাতীয় লোকরা নিজেরাও বিপথে চলে, আর মানুষকেও বিপথে পরিচালিত করে।
৬ – অন্যদের মাঝে ইসলামী জ্ঞান ছড়িয়ে দেয়া: শুধু নিজে দ্বীন শিখলেই চলবে না, আমাদের পরিবারের সদস্যদের ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে, আমাদের পরিচিতদের মধ্যে যারা ইসলামী জ্ঞানচর্চা থেকে দূরে সরে গেছে তাদেরকেও ইসলামের আলোর সন্ধান দিতে হবে। কারন, আমরা যদি মানুষকে আল্লাহর পথে না ডাকি, অন্যরা আমাদেরকে শয়তানের দিকে ডাকবে। একজন মুসলিমের জন্য অন্যদের কাছে ইসলামী জ্ঞান তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তা বুঝাতে যেয়ে সহীহ বুখারীতে নুমান ইবনে বশীর থেকে বর্ণিত চমৎকার একটা হাদিস আছে।
রাসূলুল্লাহ(সা) বলেন, কিছু মানুষ একটা জাহাজে উঠেছিলো, যার কেউ ছিলো উপরের তলায়, কেউ ছিলো নিচের তলায়। উপরের তলার লোকদের কাছেই শুধু পানির ব্যবস্থা ছিলো, তাই নিচের লোকদের পানির দরকার পড়লে তাদের উপরের তলায় যাওয়া লাগতো। নিচতলার লোকেরা মনে করলো, আমরা তো বারবার উপরে যেয়ে উপর তলার লোকদেরকে ডিসটার্ব করছি, কেননা আমরা জাহাজে একটা ফুটো করে ফেলি, তাহলে আমরা নিচে বসেই পানি পাবো আর উপরের তলার মানুষগুলোকেও বিরক্ত করবো না। এখন উপরের তলার মানুষগুলো যদি নিচের মানুষগুলোর ব্যাপারে তোয়াক্কা না করে তাহলে দুই দলই ডুবে মরবে, আর উপরের মানুষগুলো যদি নিচের মানুষগুলোকে বাধা দেয় তো দুই দলই বাচঁবে।
একইভাবে, যার মধ্যে ইসলামী জ্ঞান নাই সে অন্য মুসলিমের উপকার করতে যেয়ে ক্ষতি করে বসতে পারে। যে ইসলাম সম্বন্ধে জানেনা সে শুধু নিজেই পানিতে ডুবে মরে না, নিজের অজান্তেই  আশে পাশের লোকগুলোকেও পানিতে ডুবায়। আর তাই আমাদের নিজেকে ইসলাম শিখলে আর পালন করলেই চলবে না, যার যতটুকু সাধ্য আছে তার সাহায্যে আমাদের পরিচিতদেরকেও ইসলাম সম্বন্ধে জানাতে হবে।
৭ – ধৈর্য্যধারণ করা: ফিতনার সময় আমরা মানসিক চাপের মধ্যে থাকি, ফলে ছোটখাটো ঘটনাতেও নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি। তাই, এই সময় আমাদের ধীর স্থির থাকতে হবে, ধৈর্য্য ধরতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে আল্লাহ বলেছেন, নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই আছে স্বস্তি (সূরা ইনশিরাহ ৯৪:৫-৬)।
সা’দ ইবনু আবি ওয়াক্কাস (রা) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ(সা) বলেন: অনতি বিলম্বেই এমন এক বিপর্যয়ের আত্মপ্রকাশ ঘটবে যখন বসে থাকা ব্যক্তি দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তির চেয়ে ভালো (নিরাপদ) থাকবে, দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তি হেঁটে চলা ব্যক্তির চেয়ে ভালো থাকবে, আর হেঁটে চলা ব্যক্তি দৌড়ে চলা ব্যক্তির চেয়ে ভালো থাকবে। সাদ(রা) জিজ্ঞেস করলেন: আপনি এ ব্যাপারে কি মনে করেন যদি ফিতনাবাজ কোনো লোক আমার ঘরে প্রবেশ করে এবং আমাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়? রাসূলুল্লাহ(সা) উত্তর দিলেন: তুমি আদমের ছেলে (হাবিলের) মতো হয়ে যাও। [কাবিল যখন হাবিলকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছিলো তখন হাবিল বলেছিলো: ‘আমাকে হত্যা করার জন্য তুমি আমার প্রতি হাত তুললেও তোমাকে হত্যা করার জন্য আমি তোমার প্রতি হাত তুলবো না, আমি তো বিশ্বজগতের রবকে ভয় করি’। (সূরা মায়িদাহ ৫:২৮)] (সহীহ আত-তিরমিযী ২১৯৪)
পার্থিব / Worldly যে কাজগুলো করতে হবে:
parthib
১ – ফিতনাগ্রস্ত মানুষকে যতদূর সম্ভব সাহায্য করা: অনেক সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অকস্মাৎ দুর্ঘটনা, অত্যাচারী শাসক ইত্যাদী কারণে মানুষ ফিতনার কবলে পড়ে। এসময় ফিতনায় পড়া মানুষগুলোকে  সামর্থ্যমতো সাহায্য করা আমাদের দায়িত্ব। এই সাহায্য হতে পারে অর্থ দিয়ে, খাবার দিয়ে, বস্ত্র দিয়ে, আবার এটা পারে ফিতনাগ্রস্ত মানুষের সম্পর্কে (সম্পূর্ণ নিশ্চিত হয়ে) সঠিক তথ্য ফেইসবুক, টুইটার ও বিভিন্ন আলোচনায় তুলে ধরে মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করে।
 আব্দুল্লাহ ইবনে ‘আমর ইবনুল ‘আস হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ(সা) বলেন: আব্দুল্লাহ ইবনে ‘আমর ইবনুল ‘আস হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ(সা) বলেন: (কেয়ামত যখন কাছে আসবে) তখন একের পর এক ভয়াবহ ফিতনা আসবে, যেটা নতুন আসবে সেটার তুলনায় আগেরটাকে নগণ্য মনে হবে। যখন একটা ফিতনা আসবে তখন ঈমানদার বলবে, এবারই মনে হয় ধ্বংস হয়ে যাবো। কিন্তু এই ফিতনা পার হয়ে যাবে, এরপর নতুন আরেকটা ফিতনা আসবে, আর ঈমানদার বলবে: এবার নিশ্চিত ধ্বংস হয়ে যাবো। সে সময়  যে কেউ জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা পেতে চায় এবং জান্নাতে প্রবেশ করতে চায়, সে যেন আল্লাহ্ এবং শেষ দিবসের উপর ঈমান রাখে, আর অন্য মানুষের সাথে সেইরকম ব্যবহার করে যেরকম ব্যবহার সে চায় অন্যেরা তার সাথে করুক। – (সহীহ মুসলিম ২০/৪৫৪৬ এর অংশবিশেষ)
২ – আইন না ভেঙে অন্যায়ের প্রতিবাদ করা: অন্যায়কে ঘৃণা করা আমাদের ঈমানের অংশ। কিন্তু, তাই বলে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে যেয়ে এমন কিছু করা যাবে না যাতে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই সকল আইনসিদ্ধ উপায়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে, প্রতিবাদ করতে হবে, কিন্তু আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া যাবে না। আমরা অন্যায়ের প্রতিবাদ জানাবো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিবো, কিন্তু এগুলো করবো শুধুই আইনসিদ্ধ উপায়ে
রাসূলুল্লাহ(সা) বলেন: যদি তোমাদের মধ্যে কোনো লোক কোনো অন্যায় সংঘটিত হতে দেখে তাহলে সে যেন তার হাত দ্বারা (অর্থাৎ ক্ষমতা প্রয়োগে) তা প্রতিহত করে, যদি এই যোগ্যতা তার না থাকে সে যেন তার মুখ দ্বারা তা প্রতিহত করে। আর এই যোগ্যতাও তার না থাকে তাহলে সে যেন তার অন্তর দ্বারা তা প্রতিহত করে (অর্থাৎ অন্যায়কে ঘৃণা করে) – আর এটা হলো দুর্বলতম ঈমান। – (মুসলিম, ইবনু মাজাহ, সহীহ আত-তিরমিযী ২১৭২)
এই হাদিসের ব্যাখায় স্কলারেরা [১১] বলেন: হাত দ্বারা অন্যায় প্রতিহত করা সরকার ও তার প্রশাসনের কাজ। সিভিলিয়ানরা হাত দিয়ে অন্যায় প্রতিরোধ তখনই করতে পারবে যখন সেটা তার আওতায় পড়বে। যেমন, কেউ আপনার বাসায় চুরি করতে ঢুকলো আর আপনি তাকে প্রতিহত করলেন। কিন্তু, অন্যায় প্রতিহত করার মানে এইটা না যে সরকারের কোন কাজ পছন্দ হলো না আর রাস্তায় যেয়ে ভাংচুর, হরতাল শুরু করে দিলাম। আর, মুখ দিয়ে প্রতিবাদ সেই ব্যক্তিই করবে যার ইসলাম সম্বন্ধে এবং ঐ ফিতনা সম্বন্ধে জ্ঞান আছে, কারণ নাহলে ভুল কথা বলে সে উপকারের বদলে ক্ষতি করে ফেলবে। যখন কোনও সমাজে কোনো অত্যাচারী আঘাত হানে তখন ঐ দেশের আলেম ও জ্ঞানী ব্যক্তিদের দায়িত্ব হলো মৌখিকভাবে তার প্রতিবাদ করা এবং মানুষকে গাইডলাইন দেয়া। আর যে ব্যক্তির ক্ষমতাও নেই, জ্ঞানও নেই সে চুপচাপ থাকবে, কিন্তু অন্যায়কে ঘৃণা করবে। অন্যায়কে ঘৃণা করা ঈমানের অংশ।
৩ – শাসক অত্যাচারী হলেও তার বিরুদ্ধে অস্ত্র না ধরা: স্কলারদের এ ব্যাপারে ইজমা’ (ঐক্যমত) রয়েছে যে শাসক অত্যাচারী হলেও তার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরা যাবে না (ব্যতিক্রম ও বিস্তারিত জানতে পড়ুন:,,)। অত্যাচারী শাসকের বিরদ্ধে অস্ত্র ধরলে শাসক আরো হিংস্র হয়ে উঠে, ফলে ক্ষয়-ক্ষতি আরো বেড়ে যায়। বরং, অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে ধৈর্য ধরতে হবে, যেভাবে ইসরাইলবাসী ফেরাউনের অত্যাচারের সময় ধৈর্য্য ধরেছিলো। রাসূলুল্লাহ(সা) এর মাক্কী জীবনে সুমাইয়া বিনতে খাইয়াত সহ অন্যান্য সাহাবীদের কুরাইশবাসীরা অত্যাচার করতে করতে মেরে ফেলেছিলো, রাসূলুল্লাহ(সা) এর মাথায় উটের নাড়ি-ভূড়ি ঢেলে দিয়েছিলো – কিন্তু তাই বলে আমাদের প্রিয়নবী মুহাম্মাদ(সা) কুরাইশবাসীর বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিতে বলেননি, ধৈর্য ধরতে বলেছিলেন। তাবে-তাবেঈনদের যুগে ইরাকের অত্যাচারী গভর্ণর হাজ্জাজ বিন ইউসুফ ১ লক্ষ ২০ হাজার মুসলিমকে হত্যা করেছিলো, যার মধ্যে বহু তাবেঈন/ তাবে-তাবেঈন ছিলো, সে যুগের শ্রেষ্ঠ স্কলার হাসান আল বসরী তারপরেও হাজ্জাজের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরার জন্য মুসলিমদের অনুমতি দেন নাই
হুদাইফা বিন আল-ইয়ামান(রা) রাসূলুল্লাহ(সা) কে জিজ্ঞেস করলেন: ‘হে রাসূলুল্লাহ, আমরা তো অনেক মন্দের মধ্যে ছিলাম, আল্লাহর আমাদের (ইসলামের মাধ্যমে) ভালো  করলেন এবং আমরা এখন এই ভালোর মধ্যেই আছি। এই ভালো সময়ের পর কি আবার মন্দ সময় আসবে?’ রাসূলুল্লাহ(সা) বললেন: হ্যাঁ।হুদাইফা বিন আল-ইয়ামান(রা) জিজ্ঞেস করলেন: আর সেই মন্দের পর কি আবার ভালো আসবে? রাসূলুল্লাহ(সা) বললেন: হ্যাঁ।
হুদাইফা বিন আল-ইয়ামান(রা) জিজ্ঞেস করলেন: আর সেই ভালোর পর কি আবার মন্দ আসবে? তিনি(সা) বললেন: হ্যাঁ।
হুদাইফা জিজ্ঞেস করলেন: এটা কিভাবে হবে? তিনি (সা) বললেন: আমার পরে এমন শাসক আসবে যারা আমার দিকনির্দেশনা ও সুন্নত মেনে চলবে না। তাদের কিছু লোকের মানুষের শরীরে শয়তানের হৃদয় থাকবে।
হুদাইফা জিজ্ঞেস করলেন: আমি যদি সে সময় পর্যন্ত বেঁচে থাকি তো কি করব হে রাসূলুল্লাহ(সা)? রাসূলুল্লাহ(সা) উত্তর দিলেন: তুমি তাদের কথা শুনবে এবং আদেশ মেনে চলবে, এমনকি তোমার শাসক যদি তোমার পিঠে আঘাত করে এবং তোমার সম্পদ কেড়ে নেয় তবুও । (বুখারী ও মুসলিম)
আব্দুল্লাহ(রা) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ(সা) বলেছেন: তোমরা শীঘ্রই আমার পরে স্বজনপ্রীতি, পক্ষপাতিত্ব ও তোমাদের অপছন্দনীয় অনেক বিষয় দেখতে পাবে। সাহাবীরা বললেন: হে রাসূলুল্লাহ(সা)! ঐ সময় কি করার জন্য আমাদেরকে নির্দেশ দেন? তিনি(সা) বললেন: তোমাদের উপর তাদের যে অধিকার রয়েছে তোমরা তা পূরণ করবে এবং তোমাদের (প্রাপ্য) অধিকার নিয়ে আল্লাহ তা’আলার নিকট প্রার্থনা করবে। (বুখারী, সহীহ আত-তিরমিযী ২১৯০)
হাসান আল বসরী (রহিমাহুল্লাহ) বলতেন:
অত্যাচারী শাসকের ফিতনায় পড়লে মানুষ যদি আল্লাহকে ডাকতো, আল্লাহ তাদেরকে ফিতনা থেকে মুক্তি দিতেন। কিন্তু, সেটা না করে মানুষ তরবারীর শরণাপন্ন হয়, আর তাই তারা একটা দিনের জন্যও মঙ্গল বয়ে আনতে পারে না, ফিতনার মধ্যেই পড়ে থাকে।
এর পর তিনি নিচের আয়াতটি উদ্ধৃত করতেন:
এবং যে (বনী ইসরাইল) সম্প্রদায়কে দুর্বল মনে করা হতো তাদেরকে আমি আমার বরকতময় রাজ্যের পূর্ব ও পশ্চিম প্রান্তের উত্তরাধিকারী করলাম এবং বনী-ইসরাইল সম্বন্ধে তোমার প্রতিপালকের শুভবাণী সত্যে পরিণত হলো, যেহেতু তারা ধৈর্য ধারণ করেছিলো। আর ফেরাউন আর তার সম্প্রদায়ের নির্মিত শিল্পকর্ম ও প্রাসাদসমূহ আমি ধ্বংস করে দিলাম।
– (আল কোরআন ৭:১৩৭) [তাফসীর ইবনে আবি হাতিম ৮৮৯৭]
শাসকের বিরুদ্ধে কখন অস্ত্র ধরা যাবে?
ইসলামের জেনারেল রুল হলো খারাপ কোন কিছুকে সরানোর জন্য তার চেয়েও বেশী খারাপকিছু করা যাবে না। শাইখ উসাইমিন শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার জন্য ২টি মূল শর্ত দিয়েছেন:
  • এক – যার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হবে সে স্পষ্ট কুফরীতে লিপ্ত থাকতে হবে।
  • দুই – বিদ্রোহকারীদের যুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার মতো সামর্থ্য থাকতে হবে।
 শাইখ বিন বাজ আরো কিছু শর্ত যোগ করেছেন:
  • তিন – যুদ্ধে জিতলে যে ব্যক্তিকে নেতা করা হবে সে একজন প্রকৃত সৎলোক এই ব্যাপারে নিশ্চিত থাকতে হবে।  
  • চার – বিদ্রোহের ফলে যদি পরিস্থিতির অবনতি হয় বা সিভিলিয়ানদের জান-মালের ক্ষতির আশংকা থাকে তাহলে বিদ্রোহ বা যুদ্ধ করা যাবে না।
[বিস্তারিত এখানে: http://ahlusunnahwaljamaah.com/2012/02/20/disbelieving-ruler/]
উল্লেখ্য, শাইখ ইয়াসির কাদি মনে করেন  যে হাদিসগুলোর উপর ভিত্তি করে এই ফতোয়াগুলি দেয়া হয়েছে সেই হাদিসগুলোতে এমন শাসকের কথা বলা হয়েছে যারা ইসলামী শরীয়া অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করে। কিন্তু, যে সকল রাষ্ট্র ইসলামী শরীয়া অনুযায়ী চলে না (গণতন্ত্র বা অন্য কোনো তন্ত্র অনুযায়ী চলে), তাদের ক্ষেত্রে এই ফতোয়া ঢালাওভাবে প্রযোজ্য নয়। সেই সব দেশের অত্যাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে কিভাবে প্রতিবাদ করতে হবে তা সেই দেশের আলেমরাই সঠিকভাবে বলতে পারবেন [9]।
৪ – মুসলিমরা ঐক্যবদ্ধ থাকা: মুসলিম জাতির উপর যখন কোনো ফিতনা আসবে তখন মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে, সূরা কাহফে বর্ণিত গুহাবাসীর ঘটনা থেকে আমরা এই শিক্ষা পাই। অত্যাচারী রাজা যখন মুসলিমদের ইসলাম পালনে বাধা দিচ্ছিল এবং চরম অন্যায়-অত্যাচার করছিলো তখন মুসলিমেরা সকলে মিলে এক হয়ে গুহায় যেয়ে আশ্রয় নিয়েছিলো। তাই, যখন ফিতনা আসবে তখন আমাদের মুসলিম ইমামের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, এমন ইমাম যিনি কোরআন ও সুন্নাহকে অনুসরণ করে চলেন। আর এরকম ইমাম না পেলে সকল দলমত পরিত্যাগ করে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে হবে।
হুযায়ফা ইবনু ইয়ামান (র)) হতে বর্ণিত। প্রিয়নবী রাসূলুল্লাহ(সা) কে ফিতনার যুগ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে রাসূলুল্লাহ(সা) বললেনঃ (ফিতনার সময়) জাহান্নামের প্রতি আহবানকারী এক সম্প্রদায় থাকবে। যে ব্যক্তি ঐ সম্প্রদায়ের আহবানে সাড়া দেবে, তাকে তারা জাহান্নামে নিক্ষেপ করে ছাড়বে।
হুযায়ফা বললেন: হে রাসূলুল্লাহ(সা)! তাদের কিছু বৈশিষ্ট্যের কথা আমাদের বর্ণনা করুন।   তিনি (সা) বললেনঃ তারা আমাদেরই লোক এবং আমাদেরই ভাষায় কথা বলবে।
হুযায়ফা জিজ্ঞেস করলেন: যদি এরুপ পরিস্থিতি আমাকে পেয়ে বসে, তাহলে কি করতে নির্দেশ দেন? তিনি (সা) বললেনঃ মুসলিমদের জামাআত ও ইমামকে আকড়ে থাকবে।
হুযায়ফা জিজ্ঞেস করলেন: যদি তখন মুসলিমদের কোন (সঙ্ঘবদ্ধ) জামাআত বা ইমাম না থাকে? তিনি (সা) বললেন: তখন সকল দলমত পরিত্যাগ করে সম্ভব হলে কোন গাছের শিকড় কামড়িয়ে পড়ে থাকবে, যতক্ষন না সে অবস্হায় তোমার মৃত্যু উপস্থিত হয়। (বুখারী ৬৬০৫ এর অংশবিশেষ)
৫ – শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে কোনো তথ্য শেয়ার করা থেকে বিরত থাকা: বর্তমান যুগে ফিতনার অন্যতম উৎস হলো টিভি, অনলাইন-অফলাইন সংবাদপত্র, ফেইসবুক, ইউটিউব, টুইটার ইত্যাদি। বর্তমান সময়ের মিডিয়াগুলিযে সংবাদ প্রকাশ করলে তাদের স্বার্থ উদ্ধার হবে শুধু সেগুলো প্রকাশ করে, সত্যকে-মিথ্যার সাথে মিলিয়ে-মিশিয়ে এমনভাবে পরিবেশন করে যে তাতে প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরার পরিবর্তে তারা সূক্ষ্মভাবে তাদের দৃষ্টিভংগী তুলে ধরে। এসব সংবাদ মাধ্যমগুলোর বানানো খবরগুলো সম্বন্ধে নিশ্চিত না হয়ে ফেইসবুকে, অনলাইনে শেয়ার করার মাধ্যমে আমরা অনেক সময় নিজের অজান্তেই ভয়ানক সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কলহের সূত্রপাত করি।
আমাদের মনে রাখতে হবে প্রত্যেক ফেইসবুক লাইক, কমেন্ট আর প্রত্যেক শেয়ারের জন্য আমাদের জবাব দিতে হবে। কিন্তু, একথাও সত্য যে আমাদের পক্ষে প্রত্যেকটি তথ্য ব্যক্তিগতভাবে ভেরিফাই করা সম্ভব না। কাজেই এই ক্ষেত্রে, আমরা যদি এমন কোন ব্যক্তি বা মিডিয়ার থেকে কোন তথ্য পাই যাকে আমরা অতীতে একাধিক সময়ে ভেরিফাই করে সত্যবাদী রূপে পেয়েছি, শুধু তার থেকে পাওয়া তথ্যই শেয়ার করা উচিত হবে। 
রাসূলুল্লাহ(সা) বলেন: কোন মানুষের মিথ্যুক হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, সে যেটা শুনে সেটাই বলে। – (মুসলিম)
হে ঈমানদারগণ! যদি কোনো পাপাচারী তোমাদের নিকট কোন বার্তা নিয়ে আসে তাহলে তোমরা তা পরীক্ষা করে দেখবে, যাতে অজ্ঞাতবশত: তোমরা কোনও সম্প্রদায়কে আঘাত না করো এবং পরে তোমাদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হও। (সূরা হুজুরাত ৪৯:৬)
৬ – বিভ্রান্তিকর সকল কিছু থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা: যে মানুষ যে লেখা পড়ে, যার সাথে চলে সে তার মতো হয়ে যায়। ফিতনার সময় যেহেতু বেশীরভাগ মানুষই দিকনির্দেশনাহীন ভাবে চলে, কোরান-সুন্নাহ থেকে দূরে সরে যায়, তাই একজন মুসলিম এই সময় সঠিকপথে থাকতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে, দরকার পড়লে নিজেকে সকল বিভ্রান্তিকর সংবাদমাধ্যম ও মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে। রাসূলুল্লাহ(সা) বুখারীতে বলেছেন, ফিতনার সময় ফিতনার দিকে (প্রয়োজনের অতিরিক্ত) তাকানো পর্যন্ত যাবে না, যে ফিতনার দিকে তাকাবে তাকেই ফিতনায় পেয়ে বসবে।
আবু মুসা(রা) হতে বর্ণিত। ফিতনা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ(সা) বলেছেন: এ সময় তোমরা ধনুক ভেঙ্গে ফেলো, ধনুকের ছিলা কেটে ফেলো, তোমরা ঘরের কোণে অবস্থান করো এবং আদমের ছেলে (হাবিল) এর মত হয়ে যাও (যে তার ভাই তাকে খুন করতে উদ্যত হলে তাকে ক্ষমা করে দিয়েছিলো)। (ইবনে মাজাহ, সহীহ আত-তিরমিযী ২২০৪)
উপসংহারঃ     
এই লেখায় আমি ফিতনার সময়ে একজন মুসলিমের কি করা উচিত তার একটা জেনারেল গাইডলাইন তৈরী করার চেষ্টা করেছি। লেখাটির মূল উদ্দেশ্য আমার নিজেকে গাইড করা, আর পাঠক যদি এর দ্বারা উপকৃত হয়ে থাকেন তো আলহামদুলিল্লাহ। মনে রাখবেন এটা শুধুই একটা জেনারেল গাইডলাইন, কোনও সমাজের মানুষ কোনো নির্দিষ্ট ফিতনার সম্মুখীন হলে ঐ সমাজের মুসলিমদের স্পেসিকভাবে কি করতে হবে তা ঐ দেশের সম্মানিত ইসলামিক স্কলারেরা বলতে পারবেন।

                        ----------------------------------------------------------------------------------

                        '' শুধু নিজে শিক্ষিত হলে হবেনা, প্রথমে বিবেকটাকে শিক্ষিত করুন। ''
Widget ByBlogger Maruf
Widget ByBlogger Maruf