সোমবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০১৬

রাসূলুল্লাহ ﷺ এতগুলো বিয়ে করেছিলেন কেন?

সাধারণ মুসলিমের মনে একটা প্রশ্ন প্রায়ই ঘুরপাক খায়, তা হলো – রাসূলুল্লাহ ﷺ এতগুলো বিয়ে করতে গিয়েছিলেন কেন? সাধারণ মুসলিম পুরুষ না ৪টার বেশী বিয়ে করতে পারে না? উনি তাহলে ১১টা বিয়ে করলেন কেন? –বর্তমান সময় যখন অনলাইনে ও অফলাইনে নাস্তিকতা ও ইসলাম-বিদ্বেষ চরম আকার ধারণ করেছে তখন সাধারণ মুসলিমের জন্য এই প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা জরুরী হয়ে পড়েছে। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আছে এবং এই লেখায় আমি সেই উত্তর দিব। কিন্তু সেই উত্তরে যাওয়ার আগে ছোট্ট একটা ভূমিকার অবতারণা করতে হচ্ছে।
উত্তর বুঝার প্রি-রিকুইসিট জ্ঞান:
আমাদের উপমহাদেশে রাসূলুল্লাহ ﷺ কে নিয়ে লেখা কিছু বইতে, এবং বিভিন্ন আলেমরা তাদের লেকচারে তাঁকে নিয়ে খুব বাড়াবাড়ি রকমের কথা বলে থাকেন। যেমন – রাসূলুল্লাহ ﷺ  নূরের তৈরী, তাঁকে সৃষ্টি না করা হলে কিছুই সৃষ্টি হত না, তিনি সকল প্রকার মানবিক ও জৈবিক চাহিদার উর্ধ্বে ছিলেন – ইত্যাদি। এই কথাগুলো ভুল। অবশ্যই রাসূলুল্লাহ ﷺ  সব মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ মানুষ এবং তিনি নিষ্পাপ, কিন্তু একথাও মনে রাখতে হবে তিনি আমাদের মতই রক্ত-মাংসের একজন মানুষ, যাকে তাঁর ঈমান ও আমলের কারণে আল্লাহ্‌ বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন।
বলুন, “আমি তো তোমাদের মতই একজন মানুষ যার উপর প্রত্যাদেশহয়েছে যে তোমাদের উপাস্য একমাত্র আল্লাহ্‌, তাই তাঁরই পথ অবলম্বনকরো এবং তাঁরই কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো (সূরা ফুসসিলাত ৪১:)
আমাদের মধ্যে যেমন আশা-আকাংক্ষা, দু:খ-কষ্ট, অস্থিরতা-রাগ আছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর মধ্যেও এর সবই উপস্থিত ছিল। তাঁর সাথে আমাদের পার্থক্য হলো তিনি এগুলোকে নিজের নিয়ন্ত্রণের রাখতে পারতেন, আমরা কখনো পারি, কখনো পারি না। আমাদের মধ্যে যেমন কামনা-বাসনা আছে, স্বাভাবিকভাবে মানুষ হিসাবে তাঁর মধ্যেও এগুলো ছিল। আমরা যেমন সুন্দরের প্রতি আকৃষ্ট হই, তিনিও সুন্দরের প্রতি আকর্ষণ বোধ করতেন। আমাদের সাথে তাঁর পার্থক্য হলো – আমরা আমাদের বাসনা পূরণের জন্য আল্লাহর  ﷻ দেয়া সীমা লঙ্ঘন করে ফেলি, যার দিকে তাকানো উচিত নয় তার দিকে তাকাই, যার সাথে সম্পর্ক করা আল্লাহর  ﷻ বিধানের বাইরে তার সাথেও সম্পর্ক করি। কিন্তু, রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর চাহিদা পূরণের জন্য কখনোই আল্লাহর  ﷻ দেয়া সীমাকে লঙ্ঘন করেননি, সর্বাবস্থায় আল্লাহর  ﷻ হুকুম মেনে চলেছেন।
রাসূলুল্লাহ ﷺ (বা যে কোন মানুষের) যে কোন কাজ সম্পর্কে আমাদের আপত্তি থাকবে না যদি তা নিচের দুইটা (both) বিষয়কে মেনে চলে –
এক  যদি তা আল্লাহর  ﷻ  দেয়া সীমার মধ্যে থাকে। অর্থাৎ, আল্লাহ্‌ যদি কোন কিছুকে হালাল করে থাকেন তাহলে সেটা করলে দোষের কিছু নেই।
দুই – যদি কাজটি ঐ সমাজে গ্রহণযোগ্য হয়ে থাকে। (নামাজ,রোজা তথা ইবাদতের ক্ষেত্রে এই ২য় শর্তটি পূরণ হওয়া জরুরি নয়, কিন্তু পার্থিব কাজ যেমন বিয়ে, যুদ্ধ ইত্যাদির (worldly affairs) ক্ষেত্রে এই শর্তটি গুরুত্বপূর্ণ)
উদাহরণস্বরূপ রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বহুবিবাহের কথা ধরা যাক। আমরা জানি – রাসূলুল্লাহ ﷺ বহু বিবাহ করেছেন – এটার অনুমতি আল্লাহর  ﷻ কাছ থেকেও আছে, আবার তৎকালীন সমাজেও এটা গ্রহণযোগ্য প্র্যাক্টিস ছিল – কাজেই রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বহুবিবাহ নিয়ে কোন মুসলিমের আপত্তি থাকবে না।  আবার বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় সাধারণভাবে বহু বিবাহ গ্রহণযোগ্য নয়। কাজেই কোন মুসলিম যদি সক্ষমতা থাকার পরেও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার কথা বিবেচনা করে বহুবিবাহ না করে – তাহলেও আমরা বলব সে ঠিক করেছে। অন্যদিকে, পশ্চিমা বিশ্বে সমকামিতা একটি গ্রহণযোগ্য আচরণ, কিন্তু একজন মুসলিম হিসাবে আমরা এই আচরণের পক্ষে নই কারণ এটা আল্লাহর  ﷻ দেয়া সীমার বাইরে।
এখানে বলে রাখা ভাল যে, ইসলামিক আইন যদিও কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা’ (Consensus) ও কিয়াসের (Analogy) উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত, কিন্তু এর প্রয়োগ আরো কিছু বিষয়ের উপর নির্ভর করে যার মধ্যে আছে –  মাসলাহা মুরসালা (Consideration of Public Welfare/জনতার বৃহত্তর স্বার্থ) ও উরফ (Social norm /সামাজিক রীতি)।
উপরের প্রি-রিকুইসিট জ্ঞানকে মাথায় রেখে এবার আসুন সরাসরি প্রশ্নে চলে যাওয়া যাক।
bohubibaho1
প্রশ্ন  ইসলামের যেখানে ১জন পুরুষের জন্য ৪জন স্ত্রী রাখার অনুমতি আছেসেখানেমুহাম্মাদ  কিভাবে ১১টা বিয়ে করলেনতাঁর বৈবাহিক জীবন কি অস্বাভাবিক নয়?
রাসূলুল্লাহ ﷺ এর  ১১জন স্ত্রী ছিল, যার মধ্যে ৯ জন একসাথে স্ত্রী হিসাবে ছিল (বাকী ২ জনের মৃত্যু হয়েছিল)।  তাঁর স্ত্রীদেরকে আমরা সম্মানের সাথে উম্মাহাতুল মু’মিনীন (ঈমানদারদের মাতা) বলে থাকি।
যদিও একজন মুসলিমের জন্য চারজনের বেশী স্ত্রী রাখার অনুমতি নেই, কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ কে আল্লাহ্‌ চার এর বেশী স্ত্রী রাখার অনুমতি দিয়েছিলেন। আর এই অনুমতি দেয়া হয়েছে নিচের আয়াতের মাধ্যমে।
হে নবীআমি আপনার জন্য বৈধ করেছি আপনার স্ত্রীদেরকে যাদের আপনিদেনমোহর দিয়েছেন … আর কোন ঈমানদার নারী নবীর কাছে নিবেদনকরলে আর নবী তাকে বিয়ে করতে চাইলে সে বৈধ আর  শুধু আপনারইজন্যবাকী মুমিনদের জন্য নয় [সূরা আহযাব ৩৩:৫০]
কিন্তু প্রশ্ন হলো এই সুবিধা রাসূলুল্লাহ ﷺ কে দেয়ার কারণ কি? আসুন এর কয়েকটা কারণ দেখা যাক –
রাসূলুল্লাহ  এর শারিয়াহ কিছুটা ভিন্ন ছিল
রাসূলুল্লাহ ﷺ এর শারিয়াহর কিছু অংশ সাধারণ মুসলিমদের থেকে ভিন্ন ছিল। এই ভিন্ন শারিয়াহ তাকে সুবিধা কিছু দিয়েছিল, কিন্তু দায়িত্ব দিয়েছিল তার চেয়ে অনেক বেশী। যেমন – রাসূলুল্লাহ  ﷺ এর জন্য প্রতিরাতে তাহাজ্জুদ নামাজ পড়া ওয়াজিব ছিল, একবার যুদ্ধের সরঞ্জাম পড়ে ফেলার পর যুদ্ধে না যাওয়া তাঁর জন্য হারাম ছিল, দান গ্রহণ করা তাঁর জন্য হারাম ছিল, মৃত্যুর সময় পরিবারের জন্য একটা পয়সা সম্পদ রেখে যাওয়াও তাঁর জন্য হারাম ছিল, এমন কি আজ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বংশধরের কেউ যতই দরিদ্র হোক না কেন যাকাত নিতে পারবে না।  এত কঠিন কঠিন নিয়মের বিপরীতে আল্লাহ্‌ তাঁকে খুব অল্প কিছু বিধানে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন, তার মধ্যে একটি হলো চারটির বেশী স্ত্রী রাখার অনুমতি।
রাসূলুল্লাহ  চাইলে আরো বেশী বিয়ে করতে পারতেন
রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর যৌবনের প্রাইম টাইম একজন মাত্র স্ত্রীর সাথেই কাটিয়েছিলেন – ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত তাঁর একজন মাত্র স্ত্রী ছিল। অথচ বহুবিবাহ করা আরব সমাজে একটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল এবং তিনি চাইলেই তখন একাধিক বিয়ে করতে পারতেন।  আমাদের সমাজে যেমন বিয়ের সময় ছেলেদের যোগ্যতা দেখা হয় – তার পড়াশুনা, চাকরি-বাকরি, আয়-রোজগার দেখা হয়, তৎকালীন আরব সমাজে বিয়ের সময় একটা ছেলে বা মেয়ের একটা বৈশিষ্ট্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন ছিল – তা হলো বংশমর্যাদা। রাসূলুল্লাহ ﷺ ছিলেন আরবের সবচাইতে সম্ভ্রান্ত কুরাইশ বংশের সবচাইতে সম্মানিত ও লিজেন্ডারি ব্যক্তিত্ব আব্দুল মুত্তালিব এর সবচেয়ে প্রিয় নাতি। তাই তিনি চাইলে যৌবনে ও নবুয়তির আগে ১০-১২টা বিয়ে করা তার জন্য কোন ব্যাপারই ছিল না, কিন্তু তা তিনি করেন নি।
সেই সমাজে বিয়ে ছিল ঐক্য প্রতিষ্ঠার একটি অন্যতম উপায়
বর্তমানে আমরা যে সমাজে বাস করি তাতে বিয়ের উদ্দেশ্য একটাই থাকে – সামাজিক মর্যাদা অনুযায়ী একটা ছেলে / মেয়েকে তার জীবনসঙ্গীর সাথে মিলিয়ে দেয়া। কিন্তু, আরব সমাজে “রাষ্ট্র” বলে কিছু ছিল না এবং এক গোত্রের সাথে আরেক গোত্রের ঝগড়া-যুদ্ধ লেগেই থাকত। সেকালে সামাজিকভাবে সুরক্ষিত থাকার একমাত্র উপায় ছিল গোত্রবদ্ধ হয়ে চলা, তাই সেই সমাজে বিয়ের আরেকটি অন্যতম কারণ ছিল অন্য পরিবার বা অন্য গোত্রের সাথে সম্পর্কের উন্নয়ন করা।  আর রাসূলুল্লাহ ﷺ যেহেতু আরবদের ৩ হাজার বছরের পুরনো রীতি-নীতিকে পরিবর্তন করে মাত্র ২৩ বছরে সম্পূর্ণ নতুন রাষ্ট্র-ব্যবস্থা ইসলামের প্রবর্তন করছিলেন, কাজেই এটা তার জন্য খুব জরুরী ছিল যে তিনি বিয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন গোত্রের সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করবেন। এই দিক থেকে চিন্তা করলে, বহুবিবাহের অনুমতি রাসূল্ললাহর ﷺ জন্য কোন সুবিধা ছিল না, বরং ছিল এক মহা দায়িত্ব।
নিচে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর স্ত্রীদের তালিকা ও বিয়ের মূল কারণ উল্লেখ করা হল।


 স্ত্রীর নামবিয়ের মূল কারণবিয়ের সালমন্তব্য
খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ (রা)সাধারণ সামাজিক বিয়েনবুয়তের ১০ম বছরখাদিজার প্রস্তাবে দুই পরিবারের সম্মতিতে সাধারণ বিয়ে। এটা ছিল খাদিজার ৩য় বিয়ে।
খাদিজা জীবিত থাকতে রাসূলুল্লাহ ﷺ আর কোন স্ত্রী গ্রহণ করেননি। খাদিজার মৃত্যুর সময় রাসূলুল্লাহ ﷺর বয়স ছিল ৫০ বছর।  তাঁরা দীর্ঘ ২৫ বছর সংসার করেছিলেন।
সাওদা বিনতে জাম’আ (রা)সাধারণ সামাজিক বিয়েনবুয়তের ১০ম বছররাসূলুল্লাহ ﷺর খালা খাওলা এর পরামর্শে দুই পরিবারের সম্মতিতে সাধারণ বিয়ে।
আইশা (রা) বিনতে আবু বকর (রা)সাধারণ সামাজিক বিয়ে ও বন্ধু আবু বকর (রা) এর সাথে পারিবারিক সম্পর্ক স্থাপন।এছাড়াও এতে আল্লাহর  ﷻ  পরোক্ষ নির্দেশ ছিল। (বুখারি)বিয়ের প্রতিশ্রুতি: নবুয়তের ১১ তম বছর।
একসাথে বসবাস শুরু: ১ম হিজরী

রাসূলুল্লাহ ﷺর খালা খাওলা এর পরামর্শে দুই পরিবারের সম্মতিতে সাধারণ বিয়ে।
আইশা জিনিয়াস ছিলেন। তিনি কুরআন, হাদিস, ইসলামি আইন, প্রাচীন কবিতা ও বংশ-জ্ঞান (Geneology) এ এক্সপার্ট ছিলেন। অন্যতম সর্বাধিক হাদিস বর্ণনাকারী।  তিনি রাসূলুল্লাহর ﷺ একমাত্র কুমারী স্ত্রী।
হাফসা (রা) বিনতে উমার ইবনুল খাত্তাব (রা)বন্ধু উমার(রা) এর সাথে পারিবারিক সম্পর্ক স্থাপন৩য় হিজরীএটা হাফসার দ্বিতীয় বিয়ে।  আগের বিয়ে তিনি ১১ বছর বয়সে করেছিলেন।
যাইনাব বিনতে খুযাইমা (রা)যাইনাবের দানশীলতার পুরষ্কার ও উত্তরের নাজদি অঞ্চলের সাথে সম্পর্ক স্থাপন৪র্থ হিজরীএটা ছিল তাঁর তৃতীয় বিয়ে। যাইনাব তাঁর দানশীলতার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। উহুদের যুদ্ধে তাঁর স্বামী শহিদ হওয়ার পর এরকম মহান নারীর জন্য রাসূলুল্লাহ ﷺই ছিলেন একমাত্র যোগ্য স্বামী। বিয়ের ৮ মাস পর তিনি ইন্তেকাল করেন।
উম্মে সালামা (রা)
অন্য নাম: হিন্দ বিনতে আবু উমাইয়া
উম্মে সালামার ঈমান ও আমলের পুরষ্কার৫ম হিজরীএটা ছিল তাঁর দ্বিতীয় বিয়ে। তাঁর স্বামী উহুদের যুদ্ধের আঘাতে শহীদ হন। মৃত্যুর সময় তাঁর স্বামী দু’আ করেছিলেন তিনি যেন তার চাইতেও ভালো একজনকে স্বামী হিসাবে পান। আল্লাহ্‌ সেই দু’আ রাসূলুল্লাহ ﷺ এর মাধ্যমে কবুল করেন। উম্মে সালামা বহু হাদিস বর্ণনা করেছেন।
যাইনাববিনতে জাহশ (রা)আল্লাহর  ﷻ নির্দেশ (সূরা আহযাব:৩৭) ও পালক পুত্র যে নিজের পুত্র নয় এই ধারণা সমাজে প্রতিষ্ঠা করা৫ম হিজরীএটা তাঁর ২য় বিয়ে। যাইনাব কুরাইশি ছিলেন ও রাসূলুল্লাহর ﷺ ফুপাত বোন ছিলেন। আরব সমাজে, কাযিনদের মধ্যে বিয়ে হওয়া খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার ছিল। আনাস(রা) বলেন – রাসূলুল্লাহ ﷺ যদি কোরআনের কোন আয়াত লুকাতেন তাহলে যাইনাবের সাথে বিয়ের আয়াতটাকেই লুকাতে চাইতেন (বুখারী)। – শুধু আল্লাহর  ﷻ হুকুম পালনের জন্যই রাসূলুল্লাহ ﷺ এই বিয়েটা করেন।
যুয়াইরিয়াহ বিনতে আল-হারিস (রা)বানুল মুস্তালিকের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন৫ম হিজরীএটা তাঁর ২য় বিয়ে। তিনি ছিলেন বানুল মুস্তালিক গোত্রপ্রধানের মেয়ে। যুয়াইরিয়াকে যুদ্ধবন্দি হিসাবে গ্রহণ করার পর রাসূলুল্লাহ ﷺ তাকে মুক্ত করেন এবং বিয়ে করেন। এভাবে রাসূলুল্লাহ ﷺ যুদ্ধবন্দিদের মুক্তি দেয়ার ব্যাপারে উৎসাহ দেন।  শত শত সাহাবী যুদ্ধবন্দীদের মুক্তি করে দেন।  এই বিয়ের ফলে সম্পূর্ন বানুল মুস্তালিক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে।
উম্মে হাবিবা বিনতে আবু সুফিয়ান (রা)
অন্য নাম: রামলা
কুরাইশদের মধ্য থেকে শত্রুভাব অপসারণ৭ম হিজরীএটা তাঁর ২য় বিয়ে। তৎকালীন মুশরিক কুরাইশদের অবিসংবাদিত নেতা আবু সুফিয়ানের মেয়ে। কুরাইশদের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে উম্মে হাবিবা আবিসিনিয়ায় চলে যান যেখানে তাঁর স্বামীর মৃত্যু হয়, পরে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে বিয়ে করেন। এই বিয়ে অনেক মুশরিকের মধ্যে রাসূলুল্লাহ ﷺ ও ইসলামের প্রতি ভালবাসা তৈরীতে সাহায্য করে।
১০সাফিয়া বিনতে হুয়াই (রা)ইহুদীদের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন৭ম হিজরীএটা তাঁর ২য় বিয়ে। তিনি ছিলেন ইহুদীদের বনু নাদির গোত্রের নেতার মেয়ে। তিনি প্রথম থেকেই বাবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে ইসলাম ধর্মকে পছন্দ করতেন। খন্দকের যুদ্ধে তাঁকে যুদ্ধবন্দি হিসাবে গ্রহণ করা হয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁকে মুক্তি দেন ও বিয়ে করেন। এর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ ﷺ যুদ্ধবন্দি মুক্তিতে উৎসাহ দেন ও এটাও প্রমাণ করেন – ইহুদীদের প্রতি মুসলিমদের কোন জাতিগত বিদ্বেষ নেই।
১১মাইমুনাহ বিনতে আল-হারিস(রা)
ইসলাম-পূর্ব নাম: বাররাহ
চাচা আব্বাসের অনুরোধে ও কুরাইশদের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন৮ম হিজরীএটা তাঁর ২য় বিয়ে। হুদায়বিয়ার সন্ধির পরের বছর রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন উমরা করতে মক্কা আসেন তখন চাচা আব্বাস (রা) তাঁকে অনুরোধ করেন মাইমুনাকে বিয়ে করতে।  এই বিয়ের পর রাসূল্ললাহ মক্কার কুরাইশদেরকে (যারা তখনও ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেনি) তাঁর ওয়ালিমায়  দাওয়াত দেন ও এভাবে তাদের সাথে সম্পর্কের উন্নয়নের চেষ্টা করেন।

উপরের তথ্য থেকে আমরা দেখতে পাই যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর বিয়েগুলো যে সব কারণে করেছিলেন তার মধ্যে আছে – স্বাভাবিক সামাজিক কারণ, কোন বন্ধুর সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করণ, কোন গোত্রের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন, অথবা যে গুণবতী নারীর স্বামী শহীদ হয়েছে তাঁকে সম্মানিত করার জন্য।  আর এই বিয়েগুলোর ক্ষেত্রে সেই নারীর সৌন্দর্যও যদি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে আকর্ষণ করে থাকে তাতে দোষের কিছু নেই। একজন পুরুষ তো তাকেই বিয়ে করতে চাইবে যাকে তার সুন্দর লাগে – এটাই তো স্বাভাবিক বায়োলজিকাল ব্যাপার।
রাসূলুল্লাহ  জোর করে কাউকে বিয়ে করেন নাই
রাসূলুল্লাহ  কখনোই জোর করে কাউকে বিয়ে করেননি। তিনি  যাদেরকে বিয়ে করেছেন তাঁরা প্রত্যেকেই রাসূলুল্লাহ  এর স্ত্রী হতে চেয়েছিলেন। যে তাঁর স্ত্রী হতে চায়নি, তাকে তিনি বিয়ে করেননি।
সাহিহ বুখারীতে বর্ণিত একটি হাদিস থেকে আমরা একটি ঘটনা জানি যেখানে উমাইমাহ বিনতে শাহরিল নামক এক মহিলা প্রাথমিকভাবে রাসূলুল্লাহ  এর  স্ত্রী হতে সম্মতি জানায়। কিন্তু, বিয়ের রাতে সেই মহিলা তার মত পরিবর্তন করে ও স্ত্রী হতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে। রাসূলুল্লাহ  কে দেখে সে বলে উঠে – “আমি আপনার থেকে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করছি”।  জবাবে রাসূলুল্লাহ  বলেন – “তুমি সবচাইতে বড়র কাছেই আশ্রয় চেয়েছ। যাও, তুমি তোমার পরিবারের কাছে ফিরে যাও।”   এভাবে করে বিয়ে কনসুমেট (স্বামী-স্ত্রী হিসাবে একসাথে থাকা) করার আগেই রাসূলুল্লাহ উমাইমাহকে ডিভোর্স দিয়েছিলেন। অন্য কিছু বর্ণনায় আছে, রাসূলুল্লাহ কে অপদস্থ করার জন্য কাফেররা মহিলাটাকে দিয়ে এরকম করিয়েছিল। ইতিহাসের বইগুলোতে এরকমও পাওয়া যায় যে এই মহিলা তার বাকী জীবন রাসূলুল্লার বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়ার জন্য আফসোস করতে করতে কাটিয়েছিল।
রাসূলুল্লাহ  জোর করে কোন স্ত্রীকে ধরে রাখেন নাই
রাসূলুল্লাহ ﷺ তো জোর করে কাউকে বিয়ে করেন নাই, জোর করে কাউকে বিয়ের পরে ধরেও রাখেন নাই। বরং, তাঁর যে কোন স্ত্রী চাইলেই তাঁকে ছেড়ে চলে যেতে পারতেন।
হে নবীআপনি আপনার স্ত্রীদেরকে বলুন, “তোমরা যদি পার্থিব জীবনেরভোগ  বিলাসিতা কামনা করতবে এসোআমি তোমাদেরকে ভোগবিলাসেরব্যবস্থা করে দেই আর তোমাদেরকে ভদ্রতার সাথে বিদায় দেই আর তোমরাযদি আল্লাহ্‌, তাঁর রাসূল  পরকাল চাওতবে তোমাদের মধ্যে যারা সৎ কর্মকরে আল্লাহ্‌ তাদের জন্য মহাপ্রতিদান প্রস্তুত করে রেখেছেন (সূরাআহযাব ৩৩:২৮২৯)
হাদিস থেকে আমরা বরং দেখি, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর স্ত্রীরা তাঁর কাছে ডিভোর্স তো চানই নি বরং প্রত্যেকেই যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন প্রশংসা করেছিলেন যে স্বামী হিসাবে রাসূলুল্লাহ ﷺ কতটা মহৎ ছিলেন।
ইসলাম প্রতিষ্ঠার পর তিনি আর বিয়ে করেন নাই
আমরা লক্ষ্য করলে দেখব যে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর ৭টি বিয়েই হয়েছে ৩য় থেকে ৮ম হিজরীর সময়। এটা ছিল রাসূলুল্লাহ ﷺ এর জীবনের সবচেয়ে আন্দোলিত সময়, যখন মুসলিমরা বিভিন্ন গোত্রের সাথে যুদ্ধে যাচ্ছে, আবার বিভিন্ন গোত্রের সাথে শান্তিচুক্তি করছে। কাজেই, এই সময় এই বিয়েগুলো ছিল রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারের অংশ বিশেষ। তিনি যদি নারীলোভীই হয়ে থাকবেন তাহলে তো এর আগে-পরেও তাঁর অনেক বিয়ে করার কথা ছিল। শুধু তাই না, রাসূলুল্লাহ ﷺ বেঁচেছিলেন ১১ হিজরী পর্যন্ত। কিন্তু, ৭ম হিজরির হুদায়বিয়ার সন্ধি ও হুনাইনের যুদ্ধে বিজয়ের পরে আরব ভূখন্ডে মুসলিমদের একচ্ছত্র আধিপত্য সময়ের ব্যাপারে হয়ে দাঁড়ায় – আল্লাহ্‌ নিজেই সূরা ফাতহ তে হুদায়বিয়ার সন্ধিকে “পরিষ্কার বিজয়” হিসাবে উল্লেখ করেছেন। আর তাই আমরা দেখতে পাই, ৯ম-১১তম হিজরীতে রাসূলুল্লাহ ﷺ গোত্রভিত্তিক সম্পর্ক উন্নয়নে আর কোন বিয়েও করেননি। তিনি যদি আসলেই শুধু নিজের চাহিদায় বিয়ে করে থাকতেন তাহলে তিনি ঐ শেষের ২ বছরেও বিয়ে করা করা থামাতেন না।
তথ্য সূত্র:
১) শেইখ ইয়াসির কাযীর সীরাহ লেকচার
২) ড. সাল্লাবির সীরাহ বই
৩) শেইখ সাফিউর রাহমান মুবারাকপুরীর সীরাহ বই
৪) দি কোড অফ স্কলারস – শেইখ ইয়াসির বিরজাস

                        ----------------------------------------------------------------------------------

                       '' শুধু নিজে শিক্ষিত হলে হবেনা, প্রথমে বিবেকটাকে শিক্ষিত করুন। ''
বিজ্ঞাপনের জন্য

আল্লাহ্‌ থাকতে পৃথিবীতে এত দু:খ-কষ্ট কেন ?

প্রশ্ন ১। আল্লাহ যদি সর্বশক্তিমান এবং পরম করুনাময় হন, তাহলে পৃথিবীতে এত দু:খ-কষ্ট কেন?
উত্তর: প্রথম কথা হলো, পৃথিবীতে দুঃখ-কষ্ট থাকলেও পৃথিবীতে অনেক আনন্দও আছে। বরং, পৃথিবীতে আনন্দই বেশী, নাহলে অধিকাংশ মানুষ বেঁচে থাকতে চাইত না।
বলুন, আল্লাহ্‌ তাঁর বান্দাদের জন্য যে সব সুশোভন বস্তু ও পবিত্র জীবিকা সৃষ্টি করেছেন, তা কে নিষিদ্ধ করেছে? বলুন, এসব তো ঈমানদারদের জন্য  পার্থিব জীবনে এবং বিশেষ করে কিয়ামতের দিনে। – সূরা আরাফ(৭:৩২)
দ্বিতীয়ত: অনেক সময় এমন কিছু হয় যা আপনার কাছে আপাতঃদৃষ্টিতে কষ্টদায়ক বলে মনে হয়, কিন্তু পরে যেয়ে দেখা যায় ঐ কষ্টের ঘটনাটার জন্যই আপনার জীবনে এমন কোন পরিবর্তন এসেছে যা আপনার জন্য অনেক বেশী উপকারী। আমাদের সবার জীবনেই কম-বেশী এরকম অভিজ্ঞতা আছে। এভাবে, আল্লাহ্‌ আমাদের বিভিন্ন কঠিন পরিস্থিতিতে ফেলেন, যাতে আমরা শিক্ষাগ্রহণ করতে পারি এবং কঠিনতর পরিস্থিতির জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে পারি।
তিনি (আল্লাহ্) বললেন: আমি যা জানি তোমরা তা জান না।  (সূরা বাক্বারাহ্‌ ২:৩০)।
তৃতীয়ত: এই পৃথিবীটা হলো একটা পরীক্ষার জায়গা। আল্লাহ্‌ বিভিন্ন মানুষকে বিভিন্ন ভাবে পরীক্ষা করছেন। এই পরীক্ষা আনন্দদায়ক হতে পারে, আবার কষ্টেরও হতে পারে। যেমন, আপনার যদি অনেক টাকা-পয়সা থাকে তাহলে আল্লাহ্‌ আপনাকে সম্পদ দিয়ে পরীক্ষা করছেন, যে আপনি সেই সম্পদ কিভাবে ব্যয় করবেন। আপনার যদি অনেক মেধা থাকে, তো আল্লাহ্‌ আপনাকে পরীক্ষা করছেন আপনি কিভাবে সেই মেধাকে ব্যবহার করেন।  অন্যদিকে, আপনার বা আপনার সন্তানের যখন কোন অসুখ হয় তখন আল্লাহ্‌ আপনার ধৈর্য্যের পরীক্ষা নেন। আপনার ভাই-বোন বা পরিচিত কেউ যখন কোন বিপদে পড়ে তখনও আপনার পরীক্ষা হয় আপনি তাকে কিভাবে কতটুকু সাহায্য করছেন। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোরআন-উল-কারীমে বলেন:
নিশ্চয়ই আমি তোমাদের (কাউকে) ভয় ও ক্ষুধা দিয়ে, আর (কাউকে) ধনেপ্রাণে বা ফলফসলের ক্ষয়ক্ষতি দিয়ে পরীক্ষা করব। আর যারা ধৈর্য ধরে তাদের তুমি সুখবর দাও। (তারাই ধৈর্যশীল) যাদের ওপর কোন বিপদ এলে বলে, ‘(ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজি’উন, অর্থাৎ) নিশ্চয় আমরা আল্লাহরই জন্য এবং নিশ্চয় আমরা তারই দিকে ফিরে যাব’। এদের উপর তাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে শান্তি ও করুণা বর্ষিত হয় এবং এরাই সুপথগামী।  -সূরা বাক্বারাহ্‌  (২:১৫৫-১৫৭)
আপনি যখন কোন পরীক্ষা দিতে বসেন, আপনার শিক্ষক যেমন কিছু সহজ প্রশ্ন দেন, আবার কিছু কঠিন প্রশ্নও দেন, আল্লাহ্‌ও তেমনি মানুষকে পরীক্ষা করেন বিভিন্ন আনন্দদায়ক ও দু:খজনক ঘটনার মাধ্যমে। এই জীবন শুধুই একটা পরীক্ষাকেন্দ্র, পরকালের জীবনই আসল জীবন।
আর পার্থিব জীবন তো ক্রীড়াকৌতুক ছাড়া আর কিছুই নয়; আর সাবধানীদের জন্য পরকালের আবাসই ভালো; তোমরা কি বোঝ না? – (সূরা আন’আম  ৬:৩২)
চতুর্থত: আল্লাহ্‌ তাঁর করুণার মাত্র ১ ভাগ পৃথিবী আর তার সমস্ত কিছুর মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন। বাকী ৯৯ ভাগ তিনি তাঁর কাছে রেখে দিয়েছেন যা দিয়ে তিনি কিয়ামতের দিন তাঁর অনুগত বান্দাদেরকে করুণা করবেন (সহীহ্‌ বুখারী)।
আল্লাহ্‌ তাঁর বান্দাদের প্রতি কি পরিমান ক্ষমাশীল ও করুণাময় নিচের হাদিস থেকে তার কিছু নমুনা পাওয়া যায়।
রাসূলুল্লাহ(সা) বলেন: আল্লাহ্‌ তোমাদের উপর নিযুক্ত ফেরেশতাদের নির্দেশ করলেন তোমাদের ভাল ও মন্দ কাজ লিখে রাখতে, আর এরপর তিনি শিখিয়ে দিলেন কিভাবে লিখতে হবে। কেউ যদি কোন ভাল কাজ করার নিয়ত করে এবং এরপর কাজটি না করে, আল্লাহ্‌র তার জন্য একটি পূর্ণ ভাল কাজের নেকী লিখে রাখেন। কেউ যদি কোন ভাল কাজ করার নিয়ত করে এবং এরপর কাজটি বাস্তবায়িত করে, আল্লাহ্‌র তার জন্য ঐ কাজটির যা নেকী তা ১০ থেকে ৭০০ গুণ, এমন কি এর চেয়েও বহু গুণে বৃদ্ধি করে লিখে রাখেন। অন্যদিকে, কেউ যদি কোন খারাপ কাজ করার নিয়ত করে এবং এরপর কাজটি না করে, আল্লাহ্‌র তার জন্য একটা পূর্ণ ভাল কাজের নেকী লিখে রাখেন। আর কেউ যদি কোন খারাপ কাজ করার নিয়ত করে এবং এরপর কাজটি বাস্তবায়িত করে, আল্লাহ্‌র তার জন্য একটি মাত্র গুনাহ্‌ লিখে রাখেন। (সহীহ্‌ বুখারী)
প্রশ্ন ২। তারপরো আমি কিছু ব্যাপার মেনে নিতে পারছি না। এই যেমন, কত ছোট্ট শিশুর ক্যান্সার হয়, অথবা বিল্ডিং ধসে অনেক নিরীহ মানুষ মারা যায়, কিংবা সুনামিতে কত নিষ্পাপ শিশু মারা যায় – আল্লাহ্‌ থাকতে এগুলো হয় কিভাবে? আল্লাহ্‌ কেন ওদেরকে বাঁচান না?
উত্তর: এরকম কেন ঘটে তা তিনটি কারণ/উদাহরন দিয়ে বুঝাচ্ছি।
এক –  আমরা মনে করি মারাত্মক কোনও অসুখ বা মৃত্যু মানুষের সবচেয়ে বড় ক্ষতি – এই ধারণা ঠিক না। মানুষের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো জাহান্নামে নিক্ষেপিত হওয়া, আর তাই আল্লাহ্‌ আমাদের বিভিন্ন কষ্টকর পরিস্থিতির মধ্যে ফেলে সামগ্রিকভাবে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার সুযোগ করে দেন। আল্লাহ্‌ হয়ত কারো শিশু সন্তানকে ক্যান্সার এই কারণে দিয়েছেন যে এই সন্তানটি বড় হলে খুব খারাপ মানুষ হয়ে নিজের বাবা-মা সহ অনেক মানুষের ক্ষতি করতো। সূরা কাহফে মুসা(আ) ও খিজির(আ) এর কাহিনীতে আল্লাহ্‌ এইরকম একটি ঘটনা বর্ণনা করেছেন।
ঠিক যেমন আপনি যখন আপনার বাচ্চাটিকে টীকা দিতে নিয়ে যান সে কিন্তু অনেক কাঁদতে থাকে, তাও আপনি তাকে জোর করে টীকা দেওয়ান, এমনকি তার জ্বর হতে পারে এটা জানার পরেও আপনি ডাক্তারকে টীকা দিতে বলেন। কেন বলেন? কারণ, আপনি জানেন এই সাময়িক যন্ত্রনা তাকে সারাজীবনের জন্য রোগমুক্ত করবে। একই কারণে, আল্লাহ্‌ আমাদের উপর বিভিন্ন বিপদ দেন, বিপদের মাধ্যমে তিনি আমাদের গুনাহ মাফ করেন এবং চিরস্থায়ী জান্নাতের জন্য উপযুক্ত করেন।
দুই – আল্লাহ্‌ অনেক সময় সুনামী, বন্যাসহ নানা দুর্যোগ পাঠিয়ে থাকেন মানুষের অর্জিত পাপের শাস্তি প্রদান করার জন্য  এগুলোর মাধ্যমে আল্লাহ্‌ পাপী জাতিকে পৃথিবী থেকে নির্মূল করেন, যেমন করেছেন নূহ(আ), লুত(আ) এর সম্প্রদায়কে, আদ জাতিকে, সামুদ জাতিকে। 
তিন –  আমরা শুধু ব্যক্তিগত মঙ্গলের কথা চিন্তা করি, আল্লাহ্‌ চিন্তা করেন সামগ্রিক মঙ্গলের কথা। আগেই বলেছি আল্লাহ্‌ ভবিষ্যৎ জানেন, আমরা জানি না (সূরা বাক্বারাহ্‌ ২:৩০)। আমার কাছে সাময়িক ভাবে যেটা বেদনাদায়ক মনে হয়, সেটা হয়তো আল্লাহ্‌ সামগ্রিকভাবে মানবজাতির মঙ্গলের জন্য করছেন।
যখন কোথাও সুনামী হয়, অনেক মানুষ মারা যায়, তখন যাদের মধ্যে ঈমানের ছিটে ফোঁটাও আছে তার অনুধাবন করতে পারে যে এই জীবন ক্ষণস্থায়ী, এর পেছনে ছুটা নিরর্থক, পাথেয় সঞ্চয় করতে হবে পরকালের। এভাবে এক এলাকার মানুষকে শাস্তি দেয়ার মাধ্যমে আল্লাহ্‌ অন্য এলাকার মানুষদের শিক্ষাও দিতে পারেন। আবার, যে শিশুটি বড় হয়ে পাপ কাজ করে জাহান্নামে যেতো, শিশু বয়সেই সুনামীতে তার মৃত্যু দিয়ে আল্লাহ্‌ হয়ত তাকে জান্নাতের জন্য উপযুক্ত করেছেন!  জান্নাত পেলে আমরা পৃথিবীর সব কষ্ট ভুলে যেয়ে শুধুই আল্লাহর প্রশংসা করব, অন্যদিকে যে জাহান্নামী হবে তার কাছে পৃথিবীর সমস্ত আনন্দ-উল্লাসই তুচ্ছ মনে হবে!
আনাস ইবনে মালিক (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ(সা) বলেন যে, পুনরুত্থানের দিন এমন একজন ব্যক্তিকে আনা হবে যে পৃথিবীতে আরাম-আয়েশ এবং প্রাচুর্যতার মধ্যে জীবন কাটিয়েছিল কিন্তু এখন সে জাহান্নামের বাসিন্দা হবে। এই লোকটিকে একবার মাত্র জাহান্নামের আগুনে ডুবানো হবে এবং জিজ্ঞেস করা হবে: হে আদমসন্তান! তুমি কি (দুনিয়াতে) কোনও শান্তি বা কোনও সম্পদ পেয়েছিলে? সে উত্তর দিবে: আল্লাহর কসম! না, ও আমার রব!
এবং এরপর এমন একজন ব্যক্তিকে আনা হবে যে জান্নাতের বাসিন্দা কিন্তু সে পৃথিবীতে সবচেয়ে দুর্বিষহ জীবন কাটিয়েছিলো। এই লোকটিকে জান্নাতে একবার মাত্র ডুবানো হবে এবং তাকে জিজ্ঞেস করা হবে: হে আদমসন্তান! তুমি কি (দুনিয়াতে) কোনও কষ্টের মধ্যে ছিলে? সে বলবে: আল্লাহর কসম! না, ও আমার রব! আমি দুনিয়াতে কখনোই কোনো কষ্টের সম্মুখীন হইনি বা কোনো দুর্দশায় পড়িনি। – (সহীহ মুসলিম)

                              ----------------------------------------------------------------------------------

                             '' শুধু নিজে শিক্ষিত হলে হবেনা, প্রথমে বিবেকটাকে শিক্ষিত করুন। ''

সবকিছুই যদি আল্লাহ্‌ তৈরী করে থাকেন তো আল্লাহ্‌কে কে তৈরী করলো ?

[Note: এই লেখায় আল্লাহ্‌ / ঈশ্বর / সৃষ্টিকর্তা / God সমার্থকরূপে ব্যবহার করা হয়েছে ]
প্রশ্ন ১। বিভিন্ন সময় নাস্তিকদের বলতে শুনেছি যে আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ্বাস করা অন্ধবিশ্বাস মাত্র।  ঈশ্বর বিশ্বাস কি আসলেই একটা আবেগীয় ব্যাপার,  নাকি ঈশ্বরের অস্তিত্বের যৌক্তিক প্রমান আছে?
উত্তর: নাস্তিকেরা বলে থাকে সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস একটি অন্ধবিশ্বাস। তারা বলে, যেহেতু আল্লাহকে দেখা যায়না, ধরা যায় না, শুনা যায় না, লজিক দিয়ে প্রমাণ করে যায় না – কাজেই আল্লাহ্‌ বলে কিছু নেই। কিন্তু, বাস্তব হলো সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাস এবং সৃষ্টিকর্তার ইবাদত করা মানুষের জন্মগত স্বভাব। আর যদিও নাস্তিকেরা নিজেদেরকে যুক্তিবাদী বলে দাবী করে, কিন্তু সত্য হলো সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব  যুক্তি বা লজিক দিয়ে প্রাচীণ কাল থেকেই প্রমাণিত হয়ে এসেছে।
বর্তমানে আমরা যে লজিক বা যুক্তিবিদ্যা পড়ি, তার আবিষ্কারক হলো প্রাচীণ গ্রীকের পন্ডিতগণ। গ্রীকের ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত লজিশিয়ান বা যুক্তিবিজ্ঞানী ছিলেন প্লেটো এবং তার ছাত্র এরিস্টোটল, যারা লজিককে formal discipline হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। আপনি জানেন কি এরা দুজনেই সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব (তাদের ভাষায় ‘unmoved mover’) বিশ্বাস করতেন? এরা দু’জনেই যুক্তি দিয়েই সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব প্রমাণ করে গেছেন। এর মাধ্যমে এটুকু বোঝা গেল, যুক্তিবাদী(?) নাস্তিকেরা যুক্তিবিদ্যার পিতা / পিতাতুল্যদেরকে নিজেরাই বিশ্বাস করে না।
এবার আসুন দেখি প্লেটোর যুক্তি কি ছিল। প্লেটো যে যুক্তিটি ব্যবহার করেছিলেন সেটা হলো, Design Indicates Designer, অর্থাৎ – প্রতিটি নকশারই নকশাকারী আছে। মহাগ্রন্থ কোরআনে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা এই একই যুক্তি দিয়ে বার বার অবিশ্বাসীদের নিকট স্রষ্টার অস্তিত্ব প্রমাণ করেছেন (যেমনঃ সূরা আন’আম ৬:৯৯, সূরা রুম ৩০:২০-২৭)। উদাহরন দিয়ে বুঝানো যাক। আপনি যদি সমুদ্র পারে একটা বালির ঘর দেখেন, আপনি কি চিন্তা করবেন – বাহ কি সুন্দর একটা ঢেউ এসেছিল যেটা একটা বালির ঘর তৈরি করে চলে গেছে? নাকি এটি চিন্তা করবেন, নিশ্চয়ই এখানে কোন মানুষ এসে এটা বানিয়েছিল? কাকে আপনার যুক্তিবাদী মনে হয়? এটা সম্পূর্ণই অযৌক্তিক হবে যদি কেউ বলে, যে ঐ বালির ঘর ভাগ্যক্রমে বা হাজার হাজার ঢেঊ এর মিশ্রনে হয়েছে। বরং সাধারণ বিচার-বুদ্ধি সম্পন্ন যেকোন মানুষই বলবে যে ঐ বালির ঘরটি নিশ্চয়ই কেউ না কেউ তৈরী করেছে। কারন, প্রতিটা সৃষ্টির পেছনেই স্রষ্টা থাকে। ঠিক একইভাবে, এই মহাবিশ্ব এবং এর ভিতরের সবকিছুর অবশ্যই একজন স্রষ্টা আছে।
একটা কলম নিজে নিজে তৈরি হতে পারে না, ফেইসবুক নিজে নিজে তৈরী হতে পারে না, আইফেল টাওয়ার থেকে মোনালিসা কোন কিছুই নিজে নিজে তৈরী হতে পারে না, তাহলে এত নিয়মতান্ত্রিক, নিঁখুত মহাবিশ্ব ও মানবজাতি কিভাবে নিজে নিজে তৈরী হতে পারে? একটা অণুর ভিতর তাকান, আপনি ডিজাইন দেখতে পাবেন, মহাকাশের দিকে তাকান আপনি ডিজাইন দেখতে পাবেন। সূর্য যদি পৃথিবীর আরো কাছে থাকতো তাহলে পৃথিবী অনেক বেশী গরম হয়ে যেতো, পৃথিবী থেকে সূর্য আরো দূরে থাকলে পৃথিবী ঠান্ডা হয়ে বসবাসের অনুপযুক্ত হয়ে যেতো, সূর্য পৃথিবী থেকে ঠিক ততটুকুই দূরে আছে যতটুকু দূরে থাকলে পৃথিবীটা প্রাণের টিকে থাকার উপযুক্ত হবে, সৃষ্টিজগতের এই নিঁখুত স্থাপত্য এটা প্রমান করে যে এই সৃষ্টি জগত র‍্যান্ডমলি সৃষ্টি হতে পারে না, এর পেছনে অবশ্যই একজন প্রবল পরাক্রমশালী, অসীম ক্ষমতাধর, প্রজ্ঞাময় স্রষ্টা আছেন। আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা কোরআন মাজিদে প্রশ্ন করেন:
তারা কি স্রষ্টাহীন সৃষ্টি? না তারা নিজেরা নিজেদের সৃষ্টি করেছে? না তারা আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছে? বরং তারা নিশ্চিত বিশ্বাস রাখে না । – সূরা তুর (৫২:৩৫-৩৬)
প্রত্যেকটি মানুষই এক আল্লাহ্‌র অস্তিত্বের স্বাভাবিক অনুভূতি নিয়ে জন্মায়, জন্ম থেকেই মানুষ জানে যে আল্লাহ্‌ এক এবং আল্লাহ্‌ চান আমি তার ইবাদত করি –  ইসলামের ভাষায় এই অনুভূতিকে ‘ফিতরাহ’ বলে।
কি, ‘ফিতরাহ’ এর ব্যাপারটা বিশ্বাস হচ্ছে না? বৈজ্ঞানিক প্রমান লাগবে? তাহলে শুনুন। University of Oxford এর Centre for Anthropology and Mind বিভাগের সিনিয়র রিসার্চার Dr. Justin Berrett দীর্ঘ ১০ বছর শিশুদের উপর বৈজ্ঞানিক গবেষনা করে বলেছেন:
“Young people have a predisposition to believe in a supreme being because they assume that everything in the world was created with a purpose.”
 “If we threw a handful (of babies) on an island and they raised themselves I think they would believe in God.”

প্রশ্ন ২। আচ্ছা বুঝলাম এই সৃষ্টিজগত একজন স্রষ্টা তৈরী করেছেন, কিন্তু তাহলে সেই স্রষ্টার স্রষ্টা কে?
উত্তর:  স্রষ্টা কে কেউ সৃষ্টি করতে পারে কিনা – আসুন ব্যাপারটা একটু তলিয়ে দেখি।
কখনো ডমিনোর খেলা দেখেছেন? ডমিনোগুলোকে একটার পর একটা সাজিয়ে বাইরে থেকে ধাক্কা দেয়া হয় আর তার effect শুরু হয়, একটার পর একটা ডমিনো পড়তে থাকে। সৃষ্টির ব্যাপারটাও একইরকম। একটা সৃষ্টি আরেকটা সৃষ্টির কারণ ঘটায়। এখন, আমি যদি আপনাকে বলি, কোন বাতাস ছিল না, কেউ ধাক্কা দেই নাই, অনেকগুলো ডমিনো সাজানো ছিল এবং কোন বাহ্যিক বল ছাড়া এমনি এমনি ডমিনো একটার উপর আরেকটা পড়তে শুরু করল, আপনি কি বিশ্বাস করবেন? করবেন না (নিউটনের ১ম সূত্র) । এবং যে এই বাহ্যিক বল প্রয়োগ করবে সে অবশ্যই ডমিনো হতে পারে না। কারণ সে ডমিনো হলে, অর্থাৎ সে process of creation এর অন্তর্ভুক্ত হলে তাকে push করার জন্য, অন্য কথায় তাকে সৃষ্টি করার জন্য অন্য কাউকে লাগবে। অর্থাৎ, এই বাহ্যিক বল প্রয়োগকারী স্রষ্টাকে সৃষ্টি থেকে ভিন্ন প্রকৃতির হতে হবে। সৃষ্টি যদি সসীম হয়, স্রষ্টা হবেন অসীম; সৃষ্টি যদি অন্য সৃষ্টির প্রয়োজন অনুভব করে, স্রষ্টা হবেন চাহিদার উর্দ্ধে; সৃষ্টি যদি ভুল প্রবণ হয়, স্রষ্টা হবেন ভুলের উর্দ্ধে; সৃষ্টি যদি ক্ষণস্থায়ী হয়, স্রষ্টা হবেন চিরস্থায়ী। আর এই স্রষ্টা যেহেতু অসীম ক্ষমতাশীল, অনাদি, অনন্ত, কাজেই এই রকম স্রষ্টা মাত্র একজনই থাকবেন। কারণ, একাধিক অসীম ক্ষমতাশীল, অনাদি, অনন্ত স্রষ্টার সহাবস্থান অসম্ভব।
বলুন – তিনিই আল্লাহ্‌, এক ও অদ্বিতীয়। সবাই তার মুখাপেক্ষী, তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেয়া হয়নি। এবং কেউই তার সমকক্ষ নয়। – সূরা ইখলাস (১১২:১-৪)
সুতরাং, মহাবিশ্বের অস্তিত্বই প্রমাণ করে যে স্রষ্টাকে কেউ সৃষ্টি করে নাই। কারণ, মহাবিশ্বকে যে স্রষ্টা সৃষ্টি করেছেন সেই স্রষ্টাকে সৃষ্টি করতে যদি স্রষ্টা লাগে, তাকে সৃষ্টি করতে যদি স্রষ্টা লাগে, তাকে সৃষ্টি করতে যদি স্রষ্টা লাগে – এই প্রক্রিয়া চলতেই থাকবে এবং  কোনদিনই মহাবিশ্ব সৃষ্টি হত না। এই ধাঁধার একমাত্র সমাধান হলঃ স্রষ্টাকে কেউ সৃষ্টি করেন নাই, এবং তিনি সবসময়ই ছিলেন। এই কথাই বলে মহাগ্রন্থ কোরআন:

আল্লাহ্‌ – তিনি ছাড়া আর কোন উপাস্য নাই। তিনি চিরঞ্জীব, অনাদি। তাঁকে তন্দ্রা বা নিদ্রা স্পর্শ করে না। আকাশ ও পৃথিবীতে যা-কিছু আছে সবই তাঁর। কে আছে যে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর কাছে সুপারিশ করবে? তাদের (মানুষের) সামনে ও পেছনে যা-কিছু আছে তিনি তা জানেন। তিনি যা ইচ্ছা করেন তা ছাড়া তাঁর জ্ঞানের কিছুই তারা আয়ত্ত করতে পারে না। আকাশ ও পৃথিবীব্যাপী তাঁর আসন, আর তাদের রক্ষণাবেক্ষণে তিনি ক্লান্ত হন না। তিনি অত্যুচ্চ মহামহিম। – সূরা বাক্বারাহ্‌ (২:২৫৫ – আয়াতুল কুরসী)
প্রশ্ন ৩। আমার কাছে মহাবিশ্ব নিজেই স্রষ্টা। এতে কোনও সমস্যা আছে?
উত্তর: আপনি নিশ্চয়ই বিগ ব্যাং থিউরী তে বিশ্বাস করেন। বিগ ব্যাং থিউরী মতে এই মহাবিশ্বের একটা শুরু আছে। পৃথিবীর অন্যতম বড় পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং নিজেও তার ওয়েবসাইটে এই সম্পর্কে লিখেছেন:
The conclusion of this lecture is that the universe has not existed forever. Rather, the universe, and time itself, had a beginning in the Big Bang, about 15 billion years ago.  The Beginning of Time, Stephen Hawking
যার শুরু থাকে তার সৃষ্টি হওয়ারও একটা কাল থাকে, আর যে সৃষ্টি হয় – তার অবশ্যই একজন স্রষ্টা থাকে। কাজেই মহাবিশ্ব নিজে কখনই স্রষ্টা হতে পারে না। মহাবিশ্বকে সৃষ্টি করার জন্য একজন অনন্ত-অসীম, পরম ক্ষমতাশীল স্রষ্টা লাগবে – আর সেই পরম ক্ষমতাশীল স্রষ্টাই হলেন আল্লাহ্‌ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা।
অবিশ্বাসীরা কি ভেবে দেখে না যে, আকাশ ও পৃথিবী ওতপ্রোতভাবে মিশে ছিল? তারপর আমি উভয়কে পৃথক করে দিলাম এবং প্রাণবান সবকিছু পানি থেকে সৃষ্টি করলাম। তবুও কি ওরা বিশ্বাস করবে না? – সূরা আম্বিয়া (২১:৩০)

----------------------------------------------------------------------------------

 '' শুধু নিজে শিক্ষিত হলে হবেনা, প্রথমে বিবেকটাকে শিক্ষিত করুন। ''

সব ধর্মের মানুষই তো বলে তার ধর্ম সত্য। ইসলাম যে সত্য ধর্ম তার প্রমাণ কি???

আর ওদেরকে যখন বলা হয় ‘আল্লাহ্‌ যা অবতীর্ণ করেছেন তোমরা তার অনুসরণ করো,’ তারা বলে, ‘না, না, আমাদের পূর্বপুরুষদের যেমন দেখেছি আমরা তা-ই অনুসরণ করব’। যদি শয়তান তাদেরকে জ্বলন্ত আগুনের দিকে ডাকে, তবুও কি? – সূরা লুক্বমান (৩১:২১)
আপনার কাছে কেউ যদি এসে বলে, ২ আর ২ যোগ করলে ৩ হয়, কেউ যদি এসে বলে ৪ হয় আর কেউ যদি বলে ৫ হয় – তখন আপনি তাদের বিবাদ মিটানোর জন্য কি করবেন? আপনি আপনার যুক্তি ও বুদ্ধি প্রয়োগ করবেন, এবং যেই উত্তরটাকে আপনি প্রমাণ করতে পারবেন সেটাইকেই সত্য বলে গ্রহণ করবেন। পৃথিবীর সব কিছুই যেহেতু আমরা যুক্তি দিয়ে, বুদ্ধি দিয়ে আমরা বিচার করি, তাহলে কোন্‌ ধর্ম সত্য তা বুঝার জন্যও আমরা কেন যুক্তি আর বুদ্ধি ব্যবহার করব না?
বলুন, যদি তোমরা সত্যবাদী হও, তবে প্রমাণ উপস্থাপন করো। – (সূরা বাক্বারাহ্‌ ২:১১১)
আপনি যদি কোন অমুসলিমকে জিজ্ঞেস করেন – তুমি কিভাবে প্রমাণ করবে যে তোমার ধর্ম সত্য? বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই আপনি যে উত্তর পাবেন তা হলো – আমি আমার ঈশ্বরকে ডেকে প্রার্থনা করলে তা কবুল হয়, সুতরাং আমার ধর্মই সত্য ধর্ম। আসলে এটা কোন প্রমান হলো না। যদি প্রার্থনা কবুল হওয়াই কোন ধর্ম সত্য কিনা তা প্রমাণ করতে পারে তাহলে পৃথিবীর সব ধর্মই সত্য, কারণ সব ধর্মের মানুষেরই বিভিন্ন প্রার্থনা কবুল হয়ে থাকে। কিন্তু, বিভিন্ন ধর্মগুলোর মধ্যে কনফ্লিক্টিং ব্যাপার থাকার কারণে সব ধর্মই সত্য হতে পারে না।
কোনো ধর্ম সত্য না মিথ্যা তা প্রমান করার জন্য আমাদেরকে সেই ধর্মের গ্রন্থগুলোর দিকে ফিরে যেতে হবে। যেহেতু সব ধর্মের মানুষই দাবী করে তাদের ধর্মগ্রন্থ তাদের ঈশ্বরের কাছ থেকে এসেছে , কাজেই সেই ধর্মের গ্রন্থে সৃষ্টিকর্তা অবশ্যই এমন কিছু দিয়ে দেবেন যার দ্বারা মানুষ বুঝতে পারবে যে ঐ ধর্মটা সন্দেহাতীতভাবে সত্য।
ইসলামে ধর্মের সত্যতার অসংখ্য প্রমান আছে, যেমন স্রষ্টার সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্য (তাওহীদ), কোরআনের কাব্যিক, বৈজ্ঞানিক, সংরক্ষণ সহ বিবিধ আশ্চর্য বিষয়, রাসূলুল্লাহ(সা) এর জীবনের বিভিন্ন ঘটনা ইত্যাদি। কিন্তু, এই লেখায় আমি শুধু একটি প্রমানের কথাই বলব – সেটা হলো তাওহীদ।
যে কোন ধর্মেরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন অংশ হচ্ছে স্রষ্টা ও তাঁর বৈশিষ্ট্য। কাজেই, কোন ধর্ম স্রষ্টার সংজ্ঞাই যদি ঠিক মত দিতে না পারে তাহলে তা অবশ্যই গ্রহণযোগ্য ধর্ম হতে পারে না। আপনি ইসলাম ছাড়া পৃথিবীর অন্য যে কোন ধর্ম নিয়েই পড়াশুনা করতে যান, আপনাকে সেই ধর্মের প্রচারকেরা বলবে যে স্রষ্টার অস্তিত্ব একটা আবেগীয় ব্যাপার, এটা প্রমান করা সম্ভব না, এটা তর্ক-বিতর্কের বিষয় না, অথবা তারা স্রষ্টার এমন সব বৈশিষ্ট্যের কথা বলবে – যে আপনি অবশ্যই কনফিউজড হয়ে পড়বেন । স্রষ্টার সংজ্ঞার ব্যাপারে একমাত্র ইসলাম ধর্মই ব্যতিক্রম। সুরা ইখলাসে আল্লাহ্‌ সুবহানাহু তা’আলার বৈশিষ্ট্য এত সুন্দর করে বর্ণনা করে হয়েছে, যে এরপর স্রষ্টা সম্পর্কে আর কোন দ্বিধা-দ্বন্দের অবকাশ থাকে না।
বলুন – তিনিই আল্লাহ্‌, এক ও অদ্বিতীয়। সবাই তার মুখাপেক্ষী, তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেয়া হয়নি। এবং কেউই তার সমকক্ষ নয়। – সূরা ইখলাস (১১২:১-৪)
আমার আগের লেখায় যুক্তি দিয়ে আল্লাহ্‌র অস্তিত্বের যে প্রমান দেয়া হয়েছে, আল্লাহ্‌র যে বৈশিষ্ট্যগুলোর কথা বলা হয়েছে, পৃথিবীর আর কোন ধর্মই আল্লাহ্ সম্পর্কে আপনাকে এত যৌক্তিক ও সরল উত্তর দিতে পারবে না। আল্লাহ্‌ এক, তার সাথে তুলনা করা যায় এরকম আর কিছুই নেই, তিনি সর্বশক্তিমান, তাই সব মাধ্যম ছেড়ে সরাসরি তার ইবাদত করতে হবে – এর চেয়ে সহজ আর কিছু হতে পারে? তাওহিদের বানী এতটাই সরল ও সহজাত যে কোনও মানুষ – সে শিক্ষিতই হোক আর অশিক্ষিতই হোক, তরুনই হোক আর বৃদ্ধই হোক – খুব সহজেই এটা তার হৃদয়ে ক্লিক করে।
আল্লাহ মানুষকে এক স্রষ্টায় বিশ্বাসের সহজাত প্রবৃত্তি দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন।  ইসলামের ভাষায় একে ফিতরা বলে। পৃথিবীর ২০টিরো বেশী দেশে অন্য ধর্ম থেকে ইসলামে ফিরে আসা মানুষদের মধ্যে জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে, তাদের মুসলিম হওয়ার পেছনে সবচাইতে বেশী যা তাদের প্রভাবিত করেছে তা হলো – আল্লাহ এক (তাওহীদ) [সূত্র: Contemporary Issues – Dr. Bilal Philips]।
আপনি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে ধর্মে প্রতিষ্ঠিত রাখুন। আপনি ফিতরাহ্‌ এর অনুসরণ করুন, যা দিয়ে তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ্‌র সৃষ্টিতে কোন পরিবর্তন করা না হোক। এটাই সরল ধর্ম; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না। -সূরা রুম (৩০:৩০)
আল্লাহ্‌র ইচ্ছায় এক ইসলাম ছাড়া পৃথিবীর আর সকল ধর্মে God এর ধারনা বেশ কনফিউজিং।  হিন্দু ধর্মে ঈশ্বরের ধারণা বেশ জটিল। হিন্দুরা এক ব্রাক্ষ্মণ-এ বিশ্বাস করলেও তাদের চারটি সেক্ট (saivism, shaktism, vaishnavism, smartism) এর ভিন্ন ভিন্ন দেবতা আছে [২]। এই চার সেক্ট ঈশ্বরকে ভিন্ন ভিন্ন নামে ডাকে, ভিন্ন ভিন্ন মূর্তি বানায় এবং তাদের ঈশ্বর সংক্রান্ত ধারণাও ভিন্ন। কিন্তু, সব সেক্টই প্যান্থেইসম-এ বিশ্বাস করে। যার অর্থ হচ্ছে – স্রষ্টা আর সৃষ্টির মধ্যে কোন পার্থক্য নাই, যা কিছু আমরা দেখি তার সবই স্রষ্টা আর সবই সৃষ্টি। এই বিশ্বাসের ফলে হিন্দুরা মূর্তি, পাথর, গাছ, এমনকি কেউ কেউ শিশ্ন আর যোনিকেও পূজা করে, বেশীরভাগ হিন্দু গোমূত্র আর গোবরকে পূজার উপকরণ হিসাবে ব্যবহার করে।  হিন্দু ধর্মের ঈশ্বর পৃথিবীতে দেবতা রূপে এসে ধর্ষণ, পরকীয়াসহ এমন সব কাজ করে যা কিছুতেই সৃষ্টিকর্তার কাজ হতে পারে না [৩]।
অন্যদিকে, খ্রীষ্টানরা বলবে ঈশ্বর তাঁর ছেলে যীশুকে এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন এবং মানুষের পাপের প্রায়শ্চিত্ত হিসাবে স্যাক্রিফাইস পর্যন্ত করেছেন।  কিন্তু মানুষের সন্তান যেমন মাছ হতে পারে না, তেমনি  অসীম ঈশ্বরের সন্তান কিভাবে সসীম মানুষ হতে পারে তা বোধগম্য নয়। নিজে ‘ঈশ্বর’ হওয়া সত্ত্বেও তিনি মানুষের মতই খাওয়া-দাওয়া করতেন, ঘুমাতেন, ঈশ্বরের কাছে সেজদা করতেন, তাঁর সাহায্য চাইতেন, এমনকি সাধারণ মানুষেরা মিলে এই ‘ঈশ্বর’কে হত্যা পর্যন্ত করে ফেলেছে!  শুধু তাই না, খ্রীষ্টানদের ঈশ্বর পুরো মহাবিশ্বের পালনকর্তা হলেও তার ক্ষমতা এতই সীমিত যে স্বর্গে আদম তাকে ফাঁকি দিয়ে লুকিয়ে থাকতে পারে [৪]! বাইবেলে ইব্রাহিম(আ) কে নবী বলা হয়েছে, বাইবেলের ইব্রাহিম(আ) কিন্তু ট্রিনিটি (তিন ঈশ্বরের ধারণা) প্রচার করেননি, তিনি এক ঈশ্বরের কাছেই মানুষকে আত্মসমর্পণ করতে বলেছেন অর্থাৎ তিনি ইসলাম ধর্মই প্রচার করেছেন।
অন্যদিকে ইহুদীরা বলে তারা আল্লাহ্‌র Chosen People. ইহুদী হয়ে জন্মাতে হয়, ইহুদীতে ধর্মান্তরিত হওয়া যায় না [১]। ইহুদীরা বলে ঈশ্বর নিষ্ঠুর, তারা ঈশ্বরকে অভিশাপ দেয় কারণ তাদের উপর একের পর এক গজব নেমে এসেছিল। আর, বৌদ্ধ ধর্ম তো স্রষ্টা সম্পর্কে কোনো স্বচ্ছ ধারণাই দেয় না।
মোদ্দা কথা, পৃথিবীর বাকী সব ধর্মে সৃষ্টিকর্তার সংজ্ঞা এত কনফিউজিং, কোন চিন্তাশীল মানুষ সহজেই বুঝতে পারবে যে ইসলাম ছাড়া অন্য কোন ধর্ম সত্য ধর্ম হতে পারে না।
তবে কি ওরা কোরআন সম্বন্ধে মন দিয়ে চিন্তা করে না? নাকি ওদের অন্তরে তালা লেগেছে? – সূরা মুহাম্মাদ (সা) (৪৭:২৪)

         ----------------------------------------------------------------------------------

                       '' শুধু নিজে শিক্ষিত হলে হবেনা, প্রথমে বিবেকটাকে শিক্ষিত করুন। ''

পর্ণগ্রাফি আসক্তি: ভয়াবহতা ও মুক্তির উপায় ???

(আমি অনেক সময় তরুনদের থেকে মেসেজ / ই-মেইল পাই। তারা বলে, ভাইয়া আমি কিছুতেই পর্ণগ্রাফি দেখা ছাড়তে পারছি না, আপনার ইসলাম-বিষয়ক লেখাগুলো পড়তে খুব ভালো লাগে, দয়া করে এই বিষয়ে কিছু লিখেন। এই লেখাটি তাদের জন্য উৎসর্গ করা হলো।)
মানুষকে জাহান্নামের দিকে ধাবিত করার জন্য শয়তানের অন্যতম অস্ত্র হলো নগ্নতা। আমাদের আদি পিতা-মাতা আদম(আ) ও হাওয়া(আ) শয়তান জান্নাত থেকে বের করার আগে নগ্ন করে ছেড়েছিল। আল্লাহ্‌ বলেন:
হে আদমসন্তান। শয়তান যেন তোমাদের কিছুতেই প্রলুব্ধ না করে – যেভাবে সে তোমাদের পিতামাতাকে জান্নাত থেকে বের করেছিল – সে তাদেরকে তাদের লজ্জাস্থান দেখাবার জন্য বিবস্ত্র করেছিল … (সূরা আ’রাফ ৭:২৭)
মানুষকে নগ্ন করে বিপথে নেয়ার শয়তানের সেই চক্রান্ত শেষ হয়নি, বরং যুগের পর যুগ ধরে বেড়েই গেছে। আর বর্তমানযুগে শয়তানের এই শয়তানি চরম মাত্রা লাভ করেছে ইন্টারনেট পর্ণগ্রাফির কারণে।
যে কারণে পর্ণ আপনার দেখা উচিত নয়
পর্ণগ্রাফি মানুষকে মানষিক ও শারিরীকভাবে ভারসাম্যহীণ করে দেয়। নিচে পর্ণগ্রাফির  ৬টি ভয়াবহ ক্ষতিকর পরিণতি তুলে ধরা হলো। নেক্সট টাইম যখন আপনার পর্ণ ফিল্ম দেখতে ইচ্ছে করবে, এই কথাগুলো নিজেকে মনে করিয়ে দিবেন।
পর্ণগ্রাফি আপনাকে ভালবাসার বিকৃত সংজ্ঞা শেখায়: আপনি যখন পর্ণ মুভি দেখেন তখন আপনি নিজের অজান্তেই অনুভূতিহীন, নিষ্ঠুর, স্বার্থপর মানুষে পরিণত হন। কারণ, পর্ণ মুভিগুলোতে মানুষের ভালো-লাগা, ভালোবাসা, দুঃখ-কষ্ট-আনন্দ কোন অনুভূতিকেই দেখানো হয় না, শুধু দেখানো হয় “পেনেট্রেশন”। অথচ বাস্তব জীবনে আপনি আপনার সঙ্গীকে আদর-সোহাগ করবেন, গল্প-গুজব করবেন, আড্ডা মারবেন, ঘুরতে যাবেন – এগুলো সবই একটা সুস্থ ভালবাসাময় জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পর্ন মুভি আপনার হৃদয় থেকে ভালোবাসার সেই অনুভূতিকে কেড়ে নেয়, নষ্ট করে দেয়। পর্ণ মুভি আপনাকে এভাবে প্রোগ্রাম করে ফেলে যে আপনি বিশ্বাস করা শুরু করেন যে ভালবাসার অপর নাম পেনেট্রেশন। আমেরিকায় এক জরিপে দেখা গেছে ডিভোর্স হওয়া দম্পতিদের ৫৬% ক্ষেত্রে স্বামী বা স্ত্রীর একজন পর্ণ আসক্ত।
অনেক তরুণ মনে করে – “এখন তো আমার বয়স কম, এখনো বিয়ে করিনি, এখন পর্ণ দেখি, বিয়ের পর আমি এগুলো দেখা ছেড়ে দিব”। কিন্তু, পরিসংখ্যান বলে ভিন্ন কথা – দেখা গেছে তরুন বয়সে পর্ণ দেখা যাদের অভ্যাসে পরিণত হয়, বিয়ের পরেও তাদের বেশীরভাগই পর্ণ দেখা ছাড়তে পারে না। কাজেই – আমি এখনো বিয়ে করিনি, তাই পর্ণ দেখব – এটা পর্ণ দেখার জন্য কোনও অজুহাত হতে পারে না।
)পর্ণ আপনার মানবিক অনুভূতিকে নষ্ট করে ফেলে: পর্ণ আপনাকে শেখায় মেয়েরা মানুষ নয়, শুধুই উপভোগের বস্তু। পর্ণ দেখার ফলে আপনি রাস্তা-ঘাটে, অফিসে-বিশ্ববিদ্যালয়ে যখনই কোন মেয়েকে দেখেন তখন চিন্তা করেন না তারও একটা জীবন আছে, আশা-আকাংক্ষা আছে, দু:খ-কষ্ট-আনন্দ-ভালোবাসার অনুভূতি আছে, আপনি শুধু চিন্তা করতে থাকেন এই মেয়েটার মধ্যে উপভোগ করার মত কি আছে। একটা মেয়ে রাস্তায় পা পিছলে পড়ে গেলে আপনি চিন্তা করেন না মেয়েটা ব্যাথা পেয়েছে কি না, তাকে উদ্ধার করা যায় কি না, বরং আপনি চিন্তা করেন তার শরীরের কোনও অংশ উঁকি-ঝুঁকি দিয়ে দেখা যায় কি না।একটি মেয়েকে তার সততা, মেধা ও মানবিক গুণাবলী দিয়ে বিচার না করে আপনি তাকে বিচার করেন তার শরীরের বিশেষ কিছু স্থানের আকার-আকৃতি দিয়ে। পর্ণ মুভি আপনাকে শেখায় যে ক্লাসের বন্ধু, অফিসের কলিগ থেকে শুরু করে সবার সাথেই শারিরীক সম্পর্ক গড়া যায় – এভাবে পর্ণ আপনাকে অবৈধ সম্পর্ক গড়তে উৎসাহিত করে। আমেরিকায় এক জরিপে দেখা গেছে যে গড়ে ৬৮% বিবাহ বিচ্ছেদ হয় অনলাইন পরকিয়ার কারণে।
৩) পর্ণ আপনার স্মরনশক্তি কমায়, আপনার মধ্যে ডিপ্রেশন তৈরী করে: ইসলামের স্কলারেরা সেই প্রথম থেকেই বলে আসছেন – আল্লাহ্‌ যা দেখতে নিষেধ করেছেন তার দিকে তাকালে স্মরনশক্তি, চিন্তাশক্তি কমে যায়। একবার ইমাম শাফেঈ কোরআনের কিছু আয়াত ভুলে গিয়েছিলেন। তিনি তার উস্তাদ ইমাম মালিককে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন – “তুমি হয়তো হারাম কিছু দেখেছ। তাই আল্লাহ তোমার থেকে জ্ঞান তুলে নিয়েছেন”। ইমাম শাফেঈ প্রথমে কিছুতেই মনে করতে পারছিলেন না তিনি কার দিকে হারাম দৃষ্টি দিয়েছিলেন। পরে বুঝতে পারলেন – আজকে যখন বাজারে গিয়েছিলেন তখন এক মহিলাকে তার বাহন থেকে নামতে দেখেছিলেন। যখন সে নামছিলো তখন তার পায়ের গোড়ালির উপরে একটু কাপড় উঠেছিল, আর সেটার দিকে ইমাম শাফেঈর চোখ পড়ে গিয়েছিল। সাথে সাথে ইমাম শাফেঈ আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলেন, নিজের পাপের জন্য আকুতি-মিনতি করলেন। আর এর পরেই আল্লাহ্‌ তাকে ভুলে যাওয়া কোরআনের আয়াতগুলো ফিরিয়ে দিলেন।
মনোবিজ্ঞানীরাও গবেষনায় দেখেছেন যে পর্ণ মানুষের স্মরনশক্তি কমিয়ে দেয়, চিন্তাশক্তি হ্রাস করে, অমনোযোগী করে, ডিপ্রেসড করে দেয় এবং পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। জার্মানির ডুইবার্গ-এসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী ডক্টর ক্রিস্টিয়ান লেয়ের ২৬ বছর বয়সী ২৮জন মানুষের উপর পর্ণ ছবি দেখার প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেছেন [১৩]। তিনি গবেষনায় পেয়েছেন – পর্ণ দেখার শর্ট-টার্ম ইফেক্ট হিসাবে এদের স্মৃতিশক্তি কমেছে এবং মনোযোগী হবার ক্ষমতা কমেছে। এছাড়া অন্য গবেষনায় পর্ণ দেখার লং-টার্ম ইফেক্ট হিসাবে ডিপ্রেশন, সামাজিকভাবে ব্যর্থতা ও একাকিত্ব থাকার প্রবণতা পর্যন্ত পাওয়া গেছে।
৪) পর্ণ আপনাকে অক্ষম করে দিতে পারে: গবেষনায় দেখা গেছে যে অতিরিক্ত পর্ন ভিডিও দেখলে আপনার উত্তেজিত হওয়ার ক্ষমতা লোপ পেতে পারে। এর কারণ হলো – আজকালকার পর্ণ গুলো ধারণ করা হয় হাই ডেফিনিশন ক্যামেরায়, এইসব ক্যামেরায় মেয়েদের শরীরকে এত নিঁখুতভাবে ও জুম করে দেখানো হয় যে বাস্তবে আপনার সংগীকে আপনি এভাবে দেখতে পারবেন না, ফলে সহজে উত্তেজিত হবেন না। শুধু তাই নয়, প্রত্যেকটা পর্ণ মুভি আপনার সামনে নিয়ে আসে নতুন নতুন পর্ণ মডেল, নতুন নতুন লোকেশন আর নতুন নতুন কাহিনী। আপনার ব্রেইন ক্রমেই এই নতুনত্বে অভ্যস্ত হয়ে যায়, পুরনো কিছু তখন আর আপনাকে সহজে উত্তেজিত করতে পারে না। এর ফলে, এরকম ঘটতে পারে যে আপনি কিছুতেই আর আপনার স্ত্রীকে দেখে উত্তেজিত হবেন না। কিছু কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এই অক্ষমতা এমন আকার ধারণ করে যে তারা শুধু পর্ণ মুভি দেখেই উত্তেজিত হতে পারে, এমন কি ভায়াগ্রার মতো শক্তিশালী ওষুধেও তাদের কোন কাজ হয় না। এই সমস্যাকে ইরেক্টাইল ডিস্ফাংশন বলে এবং গবেষনায় দেখা গেছে যারা কিশোর বয়সে পর্ণ দেখা শুরু করে (বিশেষ করে ১২ বছর বয়সের পূর্বে) তাদের মধ্যে এই সমস্যা সবচেয়ে প্রকট।
তবে আশার কথা এই যে, ইরেক্টাইল ডিসফাংশনে আক্রান্ত ব্যক্তির পক্ষে আবার সক্ষম হওয়া সম্ভব। গবেষনায় দেখা গেছে কোনও ব্যক্তি টানা তিন মাস পর্ণ মুভি না দেখলে ও স্বমেহন না করলে তার ব্রেইন আবার আগের প্যাটার্নে ফিরে আসে, ফলে সে ডিজিটাল মিডিয়ার বাইরে মেয়েদেরকে দেখেও উত্তেজিত হতে পারে। ভেবে দেখুন – ব্রেইনের এই নিজে নিজে সেরে উঠার ক্ষমতা আল্লাহর তরফ থেকে কত বড় রহমত! আপনি বছরের পর বছর তাঁর অবাধ্যতা করার পরেও মাত্র তিন মাস নিজেকে সংযত রাখলে আল্লাহ্‌ আবার আপনাকে পূর্বের অবস্থায় ফিরিয়ে দিবেন।
আপনি যখন পর্ণ দেখেনআপনি প্রস্টিটিউট তৈরী করেন: আপনি কি মনে করেন যারা পর্ণ মডেল হয়েছে তারা সবাই নিজের ইচ্ছাতেই পর্ণ মুভিতে এসেছে? মোটেই না। এদের অনেককেই লোভনীয় চাকুরী, ফ্রি-ট্যুর সহ বিভিন্ন মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে শুটিং স্পটে নিয়ে আসা হয়। তারপর অনেক টাকার লোভ দেখিয়ে, রঙ্গিন জীবনের স্বপ্ন দেখিয়ে পর্ণ মুভিতে অভিনয় করানো হয়। আমেরিকাতে সাধারণ কাজে ঘণ্টায় যত টাকা পাওয়া যায়, পর্ণ মুভির জন্য প্রতি ঘন্টায় তার ২০গুণ টাকা দেয়া হয়। টাকার লোভে পড়ে কলেজ-ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া মেয়েরা পর্ণ মুভিতে নাম লেখায়, আর এভাবে করেই প্রস্টিটিউট হয়ে যায়।
মানুষ নতুন নতুন পর্ণ মডেল দেখতে পছন্দ করে। আর তাই পর্ণ মুভির প্রডিউসাররাও নিত্য-নতুন প্রলোভন দেখিয়ে নতুন নতুন মেয়েদেরকে প্রস্টিটিউশনের জগতে নিয়ে আসে। আপনি যে মেয়েটাকে পর্ণ-মুভিতে  হাসতে দেখছেন, আনন্দে-উচ্ছ্বাসে ডুবে যেতে দেখছেন – কম্পিউটার বন্ধ করে দিলেই আপনার তাকে দেখতে হয় না, কিন্তু আপনার সামনে সে যাতে পরের মুভিতেও আসতে পারে তার জন্য কিন্তু তাকে প্রস্টিটিউট হিসাবেই থেকে যেতে হয়। আপনি আপনার কম্পিউটারের সামনে বসে নিত্য-নতুন পর্ণ মডেল দেখার জন্য যে ক্লিক করছেন, সে ক্লিকের ডিমান্ড মেটানোর জন্য পর্ণ মুভির প্রডিউসারকে ক্রমাগত নতুন নতুন মেয়ে জোগাড় করে সাপ্লাই দিয়ে যেতে হচ্ছে। এভাবে করে, আপাত:দৃষ্টিতে তুচ্ছ মনে হওয়া এই ক্লিকের কারণেই বিশ্বজুড়ে পর্ণ ব্যবসার পালে হাওয়া লাগছে, আর এর সূত্র ধরে নতুন নতুন মেয়ে প্রতিদিন প্রস্টিটিউট হয়ে উঠছে।
আর যে সব পর্ণ মুভি গোপনে ধারণ করা হয়, এগুলো যে কত মেয়ের জীবন নষ্ট করেছে, কত মেয়ে এগুলোর জন্য আত্মহত্যা করেছে – তার ইয়ত্তা নেই। ভেবে দেখুন – কেউ যদি গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও না দেখত, তাহলে কেউ এগুলো বানাতোও না, ফলে এই ভিডিওগুলোর জন্য কোনও মেয়ের জীবনও নষ্ট হতো না।
সব কিছু আমলনামায় লিপিবদ্ধ হচ্ছে: মনে রাখবেন, আপনি একা ঘরে কম্পিউটারের সামনে বসে যা করছেন তা আর কেউ না দেখলেও আল্লাহ্‌ দেখছেন, আর ফেরেশতারা তা লিখে রাখছে এক পরিষ্কার গ্রন্থে। আল্লাহ্‌ যদি এখনো আপনার কুকর্ম মানুষের সামনে প্রকাশ না করে দিয়ে থাকেন – তাহলে বুঝবেন আপনাকে আল্লাহ্‌ তাওবাহ করার জন্য সুযোগ দিচ্ছেন। আপনি যদি তাওবাহ না করে মারা যান, তাহলে এই গ্রন্থের সবকিছু একদিন আপনার সামনে তুলে ধরা হবে, আপনার মা-বাবা, ভাই-বোন, স্ত্রী-সন্তান, বন্ধু সবাই আপনার আমলনামা দেখতে পাবে। নিজেকে প্রশ্ন করুন – সেদিনের সেই লজ্জার সম্মুখীন কি আপনি হতে পারবেন?
lower your gaze
পর্ণ-আসক্তি থেকে মুক্তির উপায়
এতক্ষণ বললাম পর্ণগ্রাফির খারাপ পরিণতি সম্পর্কে। আর এবার পর্ণ আসক্তি ছাড়ানোর জন্য ৪টি মাত্র টিপস দিচ্ছি:
ডিজিটাল মিডিয়ার কোনো মেয়ের দিকে তাকাবেন না: আপনি কম্পিউটারে যে পর্ণস্টারদের দেখেন, বা টিভিতে যে মডেল আর ফিল্মস্টারদের দেখেন – এরা সবাই হাজার হাজার ডলার এর সার্জারী করে, মেকাপ করে, স্পেশালিষ্ট এর অধীনে ব্যায়াম করে, মেকআপ করে তাদের শরীরের প্রতিটি ইঞ্চিকে চকচকে করে তোলে মানুষের চোখে নিজেকে আকর্ষণীয়, আবেদনময়ী করে তুলতে। তার উপর আছে হাই-ডেফিনেশন ক্যামেরা, ফটোশপ আর অত্যাধুনিক ভিডিও এডিটিং সফটওয়্যার এর কারসাজী। এর ফলে আপনি কম্পিউটারে, টিভিতে, ফ্যাশন ম্যাগাজিনে যে মেয়েদেরকে দেখেন তারা নিঁখুত, পার্ফেক্ট। এমনকি আপনি চাইলে মিনিটির পর মিনিট, ঘন্টার পর ঘণ্টা ধরে এই পার্ফেক্ট ছবিগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকতে পারেন – বাধা দেয়ারও কেউ নেই। কিন্তু, বাস্তব জীবনের কোন মানুষই এরকম পার্ফেক্ট হয় না আর এরকম পিক্সেল বাই পিক্সেল জুম করে দেখাও যায় না। তাই, ডিজিটাল মিডিয়া আর বাস্তবতা এক নয়।
আপনি যতই আবেদনময়ী মেয়েদের দিকে তাকিয়ে থাকেন, ততই আপনার শরীরে ডোপেমিন নামক হরমন নিঃসৃত হয়। এই হরমন একটা নির্দিষ্ট পরিমাণে নি:সৃত হলে আপনি উত্তেজিত হয়ে পড়েন। আপনি যখন নিত্য-নতুন সুন্দর মেয়ে দেখতে থাকেন তখন আপনার আপনার শরীর নিজেকে এমনভাবে এডজাস্ট করে নেয় যাতে পরেরবার উত্তেজিত হতে আপনার আরো বেশী ডোপেমিন এর প্রয়োজন হয়, কারণ না হলে তো আপনি খুব সহজেই উত্তেজিত হয়ে পড়বেন। এমনকি আপনি যখন টিভিতে কোন আবেদনময়ী মডেলের এড দেখেন, বা ফেইসবুকে আপনার সুন্দরী বান্ধবীর ছবি দেখেন – তখনো আপনার ডোপেমিন নিঃসৃত হয়। ডিজিটাল মিডিয়ার মেয়েদেরকে আপনি যতই দেখবেন – বাস্তব জগতের একটি মেয়েকে বা আপনার স্ত্রীকে দেখে আপনার উত্তেজিত হওয়ার ক্ষমতা ততই নষ্ট হতে থাকবে। আর তাই – ডিজিটাল মিডিয়ার মেয়েদের দিকে যত কম সম্ভব তাকান।
যদি তাকাতেই হয় তো চেহারার দিকে তাকান: মেয়েদের দিকে যদি একেবারেই না তাকানো যায় তো সবচেয়ে ভালো। কিন্তু, বাস্তবতা হলো আমরা এখন যে জগতে বাস করি তাতে মেয়েদের দিকে না তাকিয়ে, তাদের সাথে মেলা-মেশা না করে চলা যায় না। বিশ্বের সাথে তাল মেলাতে আপনাকে খবর দেখতে হবে – খবর উপস্থাপন করে মেয়েরা,  আবার কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে বন্ধু-বান্ধবীদের সাথে পড়াশুনা করতে হয়, অফিসেও মেয়ে কলিগ থাকে, অনেক সময় নতুন ভালো মুভিও দেখতে ইচ্ছা করে, তাতেও নারী আছে – এমন অবস্থায় করণীয় কি? সবকিছু ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে সন্ন্যাসী হয়ে যেতে হবে? না, এভাবে জীবন চলবে না। যেটা করবেন সেটা হলো – যখনই কোন মেয়ের দিকে তাকানোর প্রয়োজন পড়বে তখন সরাসরি তার চেহারার দিকে তাকাবেন, শরীরের অন্য কোনো বিশেষ অংশের দিকে নয়। আর তাকানোর সময় নিজের নিয়তের দিকে লক্ষ্য রাখবেন, কিছুতেই যেন কোন শারিরীক আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তার দিকে না তাকান, দুঃখ-কষ্ট-রাগ-ভালোবাসার অনুভূতিসম্পন্ন একজন মানুষের সাথে কথা বলছেন এভাবে তাকান।
আপনার মায়ের সাথে, স্ত্রীর সাথে, বোনের সাথে বা মেয়ের সাথে একজন বাইরের মানুষ যখন কথা বলে তখন আপনি তার থেকে যেরকম সুন্দর-শোভন-সাবলীল-সম্মানজনক আচরণ প্রত্যাশা করেন, তার চোখ যেখানে থাকবে বলে আপনি আশা রাখেন, অন্য একটা মেয়ের ক্ষেত্রে নিজের চোখটিও সেইভাবে নিয়ন্ত্রন করুন। মনে রাখবেন, আপনি যখন একটা মেয়ের দিকে তার অজান্তে কামনার দৃষ্টি নিয়ে তাকাচ্ছেন, আপনি তার অধিকার লঙ্ঘন করছেন।
কিছুতেই নামাজ ছাড়বেন না:  সবচাইতে গুরুত্বপূর্ন উপদেশ – কিছুতেই ১টি ওয়াক্তেরও নামাজ ছাড়বেন না। আর আপনি যদি নামাজী না হয়ে থাকেন – তো আজ থেকেই ৫ ওয়াক্ত নামাজ শুরু করে দিন। কারণ, আল্লাহ্‌ বলেছেন – “নিশ্চয়ই নামাজ মানুষকে অশ্লীল কাজ ও পাপাচার থেকে দূরে রাখে” (সূরা আনকাবুত ২৯:৪৫)। এক ঘরে যেমন একইভাবে আলো আর অন্ধকার থাকে না, তেমনি একই হৃদয়ে একইসাথে নামাজ আর পর্ণগ্রাফি থাকতে পারবে না। একবার সাহাবারা রাসূলুল্লাহ(সা) কে বললো – অমুক সাহাবী বিভিন্ন ধরনের খারাপ কাজে জড়িয়ে পড়েছে। রাসূলুল্লাহ(সা) জিজ্ঞেস করলেন – সে কি এখনো নামাজ পড়ে? সবাই বললো – হ্যাঁ, পড়ে। রাসূলুল্লাহ(সা) বললেন – সে যদি নামাজ পড়তে থাকে তাহলে নামাজ তাকে অবশ্যই একদিন খারাপ কাজ থেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসবে।
৪) নিয়মিতভাবে নফল রোজা রাখুন: রোজা হচ্ছে ঢালস্বরুপ, যা কিনা আমাদেরকে পাপ কাজ থেকে দূরে সরে থাকতে সাহায্য করে। আমরা যখন রোজা রাখি তখন আমাদের পাকস্থলী ক্ষুধার্ত থাকে, ক্ষুধার্ত পাকস্থলি শরীরকে দুর্বল করে দেয়, এর ফলে আমাদের কামনা-বাসনাগুলোও দুর্বল হয়ে পড়ে। আর তাই, কামনা-বাসনাকে নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষ্যে রাসূলুল্লাহ(সা) আমাদের পরামর্শ দিয়েছেন রামাদানের রোজার বাইরেও বেশী বেশী করে নফল রোজা রাখতে।
রোজা রাখার রুটিন কেমন হবে? এর জন্যও সুন্নাহতে বিভিন্ন গাইডলাইন দেয়া আছে [১৪]। সবচেয়ে সহজ হলো – প্রতি আরবী মাসের মাঝের তিন দিন (১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ) রোজা রাখা, এর চেয়ে আরেকটু কঠিন হলো – প্রতি সপ্তাহের সোমবার ও বৃহষ্পতিবার রোজা রাখা, আর সবচেয়ে ভালো হলো দাউদ(আ) এর মতো রোজা রাখা – একদিন পর একদিন। এছাড়াও বছরের নিচের দিনগুলি রোজা রাখার জন্য বিশেষ বরকতময় –
  • রমজানের পরের মাস শাওয়াল মাসের ছয় রোজা। রমজানের পর এই রোজাগুলি রাখলে সারা বছর রোজা রাখার সাওয়াব পাওয়া যায়।
  • আরাফাতের দিন বা যিলহজ্জ্ব মাসের ৯ তারিখের (অর্থাৎ ঈদুল আযহার আগের দিনের) রোজা – যা কিনা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী বছরের গুনাহ মাফ করে দেয়।
  • যিলহজ্জ্ব মাসের প্রথম ১০ দিনের রোজা – যা কিনা আল্লাহর কাছে সবচাইতে প্রিয় নফল ইবাদত।
  • আশুরা বা মহররম মাসের ১০ তারিখের রোজা – যা কিনা পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেয়। এর সাথে মহররমের ৯ তারিখে রোজা রাখতে পারলে আরো ভালো।     
শেষ কথা: মনে রাখবেন – আপনি যত পাপ করতে পারেন, আল্লাহ্‌ তার চেয়েও বেশী ক্ষমা করতে পারেন, আপনি যতবার পাপ করতে পারেন, আল্লাহ্‌ তার চাইতেও বেশী বার আপনাকে ক্ষমা করতে পারেন, কিন্তু শর্ত হলো আপনাকে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হোন – আর কোনোদিন পর্ণ দেখবেন না। যদি শয়তানের ফাঁদে পড়ে কখনো দেখে ফেলেন তো সাথে সাথে গোসল করে দুই রাকআত নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে তাওবাহ করে নিন, দেরী করবেন না। তারপর দ্বিগুন দৃঢ়তা নিয়ে প্রতিজ্ঞা করুন – আর কোনদিন পর্ণ দেখবেন না, আপনি আর শয়তানের দাস হবেন না, শয়তান বরং আপনার দাস হবে। কিছুতেই হাল ছাড়বেন না, কিছুতেই না, শয়তান তার শয়তানীতে হাল ছাড়েনি, আপনিও আপনার ঈমানদারীতে হাল ছাড়বেন না। শুধু গন্তব্যে পৌঁছানোই সফলতা নয়, গন্তব্যে পৌঁছানোর যাত্রাটাও সফলতা।
মহান আল্লাহ্‌ বলেন:
(জান্নাত প্রস্তুত রাখা হয়েছে তাদের জন্য) যারা কোনও অশ্লীল কাজ করে ফেললে বা নিজেদের প্রতি যুলুম করলে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে আল্লাহ্‌ ছাড়া আর কে পাপ ক্ষমা করবে? (সূরা আলে-ইমরান ৩:১৩৫)

                        ----------------------------------------------------------------------------------

                        '' শুধু নিজে শিক্ষিত হলে হবেনা, প্রথমে বিবেকটাকে শিক্ষিত করুন। ''
Widget ByBlogger Maruf
Widget ByBlogger Maruf