বুধবার, ৪ মার্চ, ২০১৫

পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের পর মুনাজাত ----------





পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের পর মুনাজাত

আমাদের দেশে বলতে গেলে ভারতীয় উপমহাদেশে পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের পর দুআ-মুনাজাতের প্রচলন দেখা যায়। এ বিষয় এখন কিছু আলোচনা করার ইচ্ছা করছি।

পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ সালাত শেষে দুআ কবুল হওয়ার কথা বহু সহীহ হাদীস থেকে প্রমাণিত। তাহলে এ নিয়ে বিতর্ক কেন? আসলে পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের পর দুআ নিয়ে বিতর্ক নয়, বিতর্ক হল এর পদ্ধতি নিয়ে। যে পদ্ধতিতে দুআ করা হচ্ছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বা তাঁর সাহাবায়ে কেরাম এভাবে দুআ করেছিলেন কি-না? তাই আমি এখানে আলোচনা করব সে দুআ-মুনাজাত নিয়ে যার মধ্যে নিম্নোক্ত সবকটি শর্ত বিদ্যমান :

এক. পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের পর দুআ করা।

দুই. যে দুআ-মুনাজাত জামাআতের সঙ্গে করা হয়।

তিন. প্রতিদিন প্রতি ফরজ সালাত শেষে দুআ-মুনাজাত করা।
এ শর্তাবলী বিশিষ্ট দুআ-মুনাজাত কতটুকু সুন্নাত সম্মত সেটাই এ অধ্যায়ের মূল আলোচ্য বিষয়।

পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ সালাত আদায়ের পর প্রচলিত মুনাজাত করা না করার ব্যাপারে আমাদের দেশের লোকদের সাধারণত তিন ভাগে বিভক্ত দেখা যায়।

এক. যারা ছালাম ফিরানোর পর বসে বসে কিছুক্ষণ যিকর-আযকার আদায় করেন, যা সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।

দুই. যারা ছালাম ফিরানোর পর যিকির-আযকার না করে তাড়াতাড়ি দাঁড়িয়ে যান সুন্নাত নামায আদায়ের জন্য।

তিন. যারা ছালাম ফিরানোর পর সর্বদা ইমাম সাহেবের সঙ্গে একত্রে মুনাজাত করেন। এবং মুনাজাত শেষ হওয়ার পর সুন্নাত নামায আদায় করেন।
আর এ তিন ধরনের লোকদেরই এ সকল আমলের সমর্থনে কোনো না কোনো দলীল প্রমাণ রয়েছে। হোক তা শুদ্ধ বা অশুদ্ধ। স্পষ্ট বা অস্পষ্ট।

প্রথম দলের দলীল-প্রমাণ স্পষ্ট। তাহল বুখারী ও মুসলিমসহ বহু হাদীসের কিতাবে সালাতের পর যিকির-আযকার অধ্যায়ে বিভিন্ন যিকিরের কথা সহীহ সনদে বর্ণিত আছে, যা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার সাহাবায়ে কেরাম আমল করেছেন। অনেক ইমাম ও উলামায়ে কেরাম এ যিকির-আযকার সম্পর্কে স্বতন্ত্র পুস্তক সংকলন করেছেন।

আর দ্বিতীয় দলের প্রমাণ হল এই হাদীস
عن عائشة رضى الله عنها قالت كان النبي صلى الله عليه وسلم إذا سلم لم يقعد إلا مقدار ما يقول اللهم أنت السلام ومنك السلام تباركت يا ذالجلال والإكرام.") أخرجه ابن ماجة والنسائي والترمذي وقال حديث حسن صحيح وهو كما قال، صححه الألباني في صحيح ابن ماجه رقم الحديث 761(
আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন ছালাম ফিরাতেন তখন আল্লাহুম্মা আনতাচ্ছালাম ওয়ামিনকাচ্ছালাম তাবারাকতা ইয়া জালজালালি ওয়াল ইকরাম পড়তে যতটুকু সময় লাগে তার চেয়ে বেশি সময় বসতেন না। (তিরমিজী, নাসায়ী, ইবনু মাজাহ)
তারা এ হাদীস দ্বারা বুঝে নিয়েছেন যে, এ যিকিরটুকু আদায় করতে যতটুকু সময় লাগে এর চেয়ে বেশি বসা ঠিক নয়। তাই তাড়াতাড়ি সুন্নাত আদায়ের জন্য দাঁড়িয়ে যেতে হবে। আসলে এ হাদীস দ্বারা তারা যা বুঝেছেন তা সঠিক নয়।
হাদীসটির ব্যাখ্যা হল, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেহেতু ইমাম ছিলেন তাই তিনি ছালাম ফিরানোর পর এতটুকু সময় মাত্র কেবলামুখী হয়ে বসতেন এরপর তিনি মুসল্লীদের দিকে মুখ ফিরিয়ে বসতেন। আর তিনি যে প্রত্যেক ফরজ নামাযের পর মুসল্লীদের দিকে মুখ করে বসতেন তা বহু সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। (মজমু আল ফাতাওয়া : ইমাম ইবনু তাইমিয়া)
এ হাদীস দ্বারা কখনো প্রমাণিত হয় না যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছালাম ফিরিয়ে এ দুআটুকু পড়ে তাড়াতাড়ি দাঁড়িয়ে যেতেন সুন্নাত সালাত আদায়ের জন্য। ফরজ সালাত আদায়ের পর যিকির, তাছবীহ, তাহলীল বর্জন করে তাড়াতাড়ি সুন্নাত আদায়ের জন্য দাঁড়িয়ে যাওয়া মোটেও সুন্নাত নয়। বরং সুন্নাত হল সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত যিকির, দুআ, তাছবীহ, তাহলীল সাধ্যমত আদায় করে তারপর সুন্নাত আদায় করা।

তৃতীয় দল যারা ফরজ নামাযের পর সম্মিলিতভাবে (জামাআতের সঙ্গে) মুনাজাত করেন তাদের দলীল হল ওই সকল হাদীস যাতে সালাত শেষে দুআ কবুলের কথা বলা হয়েছে এবং দুআ করতে উৎসাহিত করা হয়েছে। এ সকল হাদীস ছাড়া তাদের এ কাজের সমর্থনে হাদীস থেকে সরাসরি কোনো প্রমাণ নেই। এমন কোনো হাদীস তারা পেশ করতে পারবেন না যাতে দেখা যাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রত্যেক সালাত জামাআতের সঙ্গে আদায় শেষে সকলকে নিয়ে সর্বদা হাত তুলে মুনাজাত করেছেন।
তারা যে সকল হাদীস প্রমাণ হিসেবে পেশ করতে চান তার শিরোনাম হল
الدعاء عقيب الصلوات،  الدعاء دبر الصلوات
তারা মনে করে নিয়েছেন আকীবাস সালাত ও দুবুরাস সালাত অর্থ ছালাম ফিরানোর পর। আসলে তা নয়। এর অর্থ হল সালাতের শেষ অংশে। এ সকল হাদীসে সালাতের শেষ অংশে অর্থাৎ শেষ বৈঠকে দরূদ পাঠ করার পর ছালাম ফিরানোর পূর্বে দুআ করার কথা বলা হয়েছে। পরিভাষায় যা দুআয়ে মাছুরা হিসেবে আমাদের কাছে পরিচিত। সালাত শেষে দুআ কবুল সম্পর্কে যত হাদীস এসেছে তা সবগুলো দুআ মাছুরা সম্পর্কে। যার সময় হল ছালাম ফিরানোর পূর্বে। আর দুআ মাছুরা শুধু একটা নয়, অনেক। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে সালাতের শেষে দুআ সংক্রান্ত এ সকল হাদীসে বাদাস সালাত বলা হয়নি। হাদীস গ্রন্থে এ সকল দুআকে
الأدعياء دبر الصلوات أو الدعاء عقيب الصلاة
(সালাত শেষের দুআ) অধ্যায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে দুটো বিষয়; প্রথমটা হল সালাত শেষের দুআ। দ্বিতীয়টা হল সালাত শেষের যিকির। প্রথমটির স্থান হল ছালাম ফিরানোর পূর্বে। আর দ্বিতীয়টির স্থান হল ছালাম ফিরানোর পর। ইমাম ইবনু তাইমিয়া রহ. ইবনুল কায়্যিম রহ. প্রমুখ উলামায়ে কেরামের মত এটা-ই।
এ মতটা কুরআন ও হাদীসের আলোকে বেশি যুক্তিগ্রাহ্য। বান্দা যখন সালাতে থাকে তখন সে আল্লাহর নিকটে অবস্থান করে। দুআ মুনাজাতের সময় তখনই। যখন সালাতের সমাপ্তি ঘোষিত হল তখন নয়। তখন সময় হল আল্লাহর যিকিরের, যেমন আল্লাহ বলেন :
فَإِذَا قَضَيْتُمُ الصَّلَاةَ فَاذْكُرُوا اللَّهَ قِيَامًا وَقُعُودًا وَعَلَى جُنُوبِكُمْ. 
যখন তোমরা সালাত শেষ করলে তখন দাঁড়িয়ে, বসে ও শুয়ে আল্লাহকে স্মরণ করবে। (আন নিসা : ১০২ )
এ সম্পর্কিত হাদীসগুলোর ভাষা এবং সঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আমলসমূহ গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে এ বিষয়টিই বুঝে আসেছালাম ফিরানোর পরের সময়টা দুআ করার সময় নয়, যিকির করার সময়।

তারপরও প্রশ্ন থেকে যায় যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফরজ সালাতের পর কখনো কি দুআ করেননি? হ্যা করেছেন। তবে তা সম্মিলিতভাবে নয়।
যেমন হাদীসে এসেছে :
عن البراء بن عازب قال : كنا إذا صلينا خلف رسول الله صلى الله عليه وسلم أحيانا  نكون عن يمينه يقبل علينا بوجهه فسمعته يقول : رب قني عذابك بوم تبعث عبادك"  (رواه البخاري)
আল-বারা ইবনু আযেব বলেন, আমরা যখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পিছনে সালাত আদায় করতাম, তিনি আমাদের দিকে মুখ করতেন, কখনো কখনো শুনতাম তিনি বলতেন, হে আল্লাহ ! আপনার শাস্তি থেকে আমাকে বাঁচান যেদিন আপনি আপনার বান্দাদের উঠাবেন। (বুখারী)

জামাআতের সঙ্গে তিনি মুসল্লীদের নিয়ে দুআ করেছেন, এমন কোনো বর্ণনা নেই। যা আছে তা তার বিপরীত। যেমন বর্ণিত হাদীসটির প্রতি লক্ষ্য করুন! সেখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একবচন শব্দ ব্যবহার করেছেন। বলেছেন আমাকে বাঁচান...। সকলকে সঙ্গে নিয়ে দুআটি করলে বলতেন আমাদেরকে বাঁচান।
আরেকটি হাদীসের প্রতি লক্ষ্য করুন :
قال النبي صلى الله عليه وسلم لمعاذ بن جبل " لا تدعن في دبركل صلاة أن تقول اللهم أعني على ذكرك وشكرك وحسن عبادتك.  )رواه  أبو داود و النسائي)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুআজ বিন জাবালকে বলেছেন, তুমি অবশ্যই প্রত্যেক সালাতের পর বলবে, হে আল্লাহ! আপনার যিকির, আপনার শোকর, আপনার জন্য উত্তম ইবাদত করতে আমাকে সাহায্য করুন। (আবু দাউদ, নাসায়ী)
দেখুন! প্রখ্যাত সাহাবী মুআজ বিন জাবাল রা. কওমের ইমাম ছিলেন। রাসূল তাঁকে ইয়েমেনের গভর্ণর, শিক্ষক ও ইমাম হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। তিনি সালাতে ইমামতি করতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে এ দুআটি সকলকে নিয়ে করার নির্দেশ দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা দেননি। তিনি তাঁকে একা একা দুআটি করার জন্য বলেছেন। হাদীসের ভাষাই তার প্রমাণ।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছালাম ফিরনোর পর তিনবার আস্তাগফিরুল্লাহ (আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাচ্ছি) বলেছেন। তিনি যদি এটা সকলকে নিয়ে করতেন তাহলে নাস্তাগফিরুল্লাহ (আমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাচ্ছি) বলতেন।

যারা ফরজ সালাত শেষে কোনো যিকির-আযকার না করে উঠে গেল তারা একটা সুন্নাত (মুস্তাহাব) ছেড়ে দিল। আবার যারা সালাত শেষে সম্মিলিতভাবে মুনাজাত করে উঠে গেল তারা একটা সুন্নাত বাদ দিয়ে সে স্থানে অন্য একটি বিদআত আমল করল।

তাই সারকথা হল, পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায়ের পর সব সময় জামাআতের সঙ্গে মুনাজাত করা একটি বিদআত। যা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম করেন নি, সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেয়ীগণ করেছেন বলেও কোনো প্রমাণ নেই।
তবে যদি কেউ জামাতে সালাত আদায়ের পর একা একা দুআ মুনাজাত করেন তা সুন্নাতের খেলাফ হবে না। এমনিভাবে ইমাম সাহেব যদি সকলকে নিয়ে বিশেষ কোনো পরিস্থিতিতে কোনো কোনো সময় দুআ-মুনাজাত করেন তবে তা নাজায়েয হবে না।
ইমাম ইবনু তাইমিয়া, ইবনুল কায়্যিম, মুফতীয়ে আজম ফয়জুল্লাহ রহ. সহ অনেক আলেম-উলামা এ মত ব্যক্ত করেছেন।

সালাত শেষে যে সকল দুআ ও জিকির হাদীস দ্বারা প্রমাণিত

আমি এখানে সালাত শেষে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেসকল দুআ ও যিকির আদায় করেছেন ও করতে বলেছেন তার কয়েকটি দৃষ্টান্ত হিসেবে পেশ করতে চাই। যাতে পাঠক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর এই সুন্নাতকে আমল হিসেবে গ্রহণ করেন এবং এ সম্পর্কিত বিদআত পরিহার করেন।
عن ثوبان رضي الله عنه قال: كان رسول الله صلى الله عليه وسلم  إذا انصرف من صلاته استغفر ثلاثا وقال اللهم أنت السلام ومنك السلام تباركت يا ذالجلال والإكرام. قيل للأوزاعي وهو أحد رواة الحديث كيف الاستغفار؟ قال : يقول : استغفر الله، استغفر الله، استغفر الله.) رواه مسلم(
সাওবান রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন যখন সালাত শেষ করতেন তখন তিনবার ক্ষমা প্রার্থনা করতেন এবং বলতেন, আল্লাহুম্মা আনতাচ্ছালাম . . . (হে আল্লাহ! তুমি শান্তিময় এবং তোমার নিকট হতে শান্তির আগমন, তুমি কল্যাণময়ত, হে মর্যাদাবান, মহানুভব!
ইমাম আওযায়ীকে জিজ্ঞেস করা হল -যিনি এ হাদীসের একজন বর্ণনাকারী- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সালাত শেষে ক্ষমা প্রার্থনা করতেন কিভাবে?
বললেন, তিনি বলতেন, আস্তাগফিরুল্লাহ! আস্তাগফিরুল্লাহ! আস্তাগফিরুল্লাহ! (আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাচ্ছি)। (মুসলিম)
كتب المغيرة بن شعبة إلى معاوية رضي الله عنه: أن رسول الله صلى الله عبيه وسلم كان إذا فرغ من الصلاة وسلم قال : لا إله إلا الله وحده لا شريك له، له الملك وله الحمد وهو على كل شيء قدير. اللهم لا مانع لما أعطيت ولا معطى لما منعت ولا ينفع ذا الجد منك الجد. (أخرجه البخاري ومسلم)
মুগীরা ইবনু শোবা রা. মুয়াবিয়া রা. এর কাছে লিখেছেন যে, নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন সালাত শেষ করে সালাম ফিরাতেন তখন বলতেন, লা-ইলাহা ইল্লাহ ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়াহুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদীর, আল্লাহুম্মা লা- মানেআ লিমা আতাইতা ওয়ালা মুতিয়া লিমা মানাতা ওয়ালা ইয়ান ফাউ জাল জাদ্দি মিনকাল জাদ্দু। (আল্লাহ ব্যতীত ইবাদতের যোগ্য কোনো মাবুদ নেই। তিনি এক তাঁর কোনো শরীক নেই। রাজত্ব তাঁরই এবং প্রশংসা তাঁর। তিনি সকল কিছুর ওপর ক্ষমতাবান। হে আল্লাহ আপনি যা দান করেন তা বাধা দেয়ার কেউ নেই। আর আপনি যা বাধা দেবেন তা দেয়ার মত কেউ নেই। আর আযাবের মুকাবেলায় ধনবানকে তার ধন কোনো উপকার করতে পারে না।) (বুখারী ও মুসলিম)
عن عبد الله بن الزبير رضي الله عنهما أنه كان يقول دبر كل صلاة حين يسلم : لا إله إلا الله وحده لا شريك له، له الملك وله الحمد وهو على كل شيء قدير. لا حول ولا قوة إلا بالله . لا إله إلا الله ولا نعبد إلا إياه له النعمة وله الفضل وله الثناء الحسن، لا إله إلا الله مخلصين له الدين ولو كره الكافرون. قال ابن الزبير : وكان رسول الله صلى الله عليه وسلم  يهلل بـهن دبر كل صلاة. (رواه مسلم(
আব্দুল্লাহ ইবনু যুবাইর রা. থেকে বর্ণিত তিনি প্রত্যেক সালাতের শেষে সালাম ফিরানোর পর বলতেন, লা-ইলাহা ইল্লাহ ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়াহুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদীর, লা হাওলা ওয়ালা কুয়্যাতা ইল্লা বিল্লাহ, লাইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়ালা নাবুদু ইল্লা ইয়্যাহ, লাহুন নিমাতু ওয়ালাহু ফজলু ওয়ালাহুছ ছানাউল হাসান, লাইলাহা ইল্লাল্লাহু মুখলিছীনা লাহুদ্দীন ওয়ালাও কারিহাল কাফিরূন। (আল্লাহ ব্যতীত ইবাদতের যোগ্য কোনো মাবুদ নেই। তিনি এক তাঁর কোনো শরীক নেই। রাজত্ব তাঁরই এবং প্রশংসা তাঁর। তিনি সকল কিছুর ওপর ক্ষমতাবান। আল্লাহ প্রদত্ত শক্তি ব্যতীত গুনাহ থেকে বিরত থাকার ও ইবাদত করার শক্তি কারো নেই। আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই। আমরা তাঁকে ছাড়া আর কারো ইবাদত করি না। সমস্ত অনুগ্রহ ও শ্রেষ্ঠত্ব তাঁরই। সকল সুন্দর ও ভাল প্রশংসা তাঁরই জন্য। তিনি ব্যতীত আর কোনো ইলাহ নেই। আমরা ধর্মকে একমাত্র তাঁরই জন্য নির্ধারণ করে নিয়েছি, যদিও কাফেরা তা পছন্দ করে না)।
ইবনু যুবাইর রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রত্যেক সালাতের শেষে এ বাক্যগুলোর মাধ্যমে আল্লাহর ইলাহিয়্যাতের ঘোষণা দিতেন। (মুসলিম)
عن أبي هريرة رضي الله عنه عن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال : من سبح الله في دبر كل صلاة ثلاثا وثلاثين وحمد الله ثلاثا وثلاثين وكبر الله ثلاثا وثلاثين وقال تمام المائة  لا إله إلا الله وحده لا شريك له، له الملك وله الحمد وهو على كل شيء قدير، غفرت خطاياه وإن كانت مثل زبد البحر. (رواه مسلم(
আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি প্রত্যেক সালাতের পর তেত্রিশবার ছুবহানাল্লাহ বলবে, তেত্রিশ বার আলহামদু লিল্লাহ বলবে ও তেত্রিশবার আল্লাহু আকবার বলবে এর পর লা-ইলাহা ইল্লাহ ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়াহুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদীর (আল্লাহ ব্যতীত ইবাদতের যোগ্য কোনো মাবুদ নেই। তিনি এক তাঁর কোনো শরীক নেই। রাজত্ব তাঁরই এবং প্রশংসা তাঁর। তিনি সকল কিছুর ওপর ক্ষমতাবান) বলে একশ বাক্য পূর্ণ করবে তার পাপগুলো ক্ষমা করে দেয়া হবে যদিও তা সমুদ্রের ফেনা পরিমাণ হয়। (মুসলিম)

এ ছাড়াও সালাতের পর আরো অনেক যিকির ও দুআর কথা হাদীসে এসেছে। সেগুলো আদায় করা যেতে পারে। যেমন সূরা ইখলাছ, সূরা ফালাক, সূরা নাছ পাঠ করার কথা এসেছে। আয়াতুল কুরসী পাঠ করার বর্ণনা এসেছে ।
এ সকল দুআ যে সবগুলো একইসঙ্গে আদায় করতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। সময় ও সুযোগ মত যা সহজ সেগুলো আদায় করা যেতে পারে।মোট কথা হল, এ সুন্নাতটি যেন আমরা কোনো কারণে ভুলে না যাই সে বিষয়ে সতর্ক থাকা দরকার। অনেককে নামায শেষে এমন কিছু আমল করতে দেখা যায় যেগুলো হাদীসে পাওয়া যায় না, সেগুলো বর্জন করা উচিত। যেমন, মাথায় হাত দিয়ে কিছু পাঠ করা বা কিছু পাঠ করে চোখে ফুঁক দেয়া ইত্যাদি।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সঠিক পথের হিদায়াত দান করুন!

                                                 -------------সমাপ্ত ----------


বিজ্ঞাপনের জন্য

মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

শয়তানের ধোঁকা থেকে বাঁচার উপায় -----


শয়তানের ধোঁকা থেকে বাঁচার উপায়


মানুষকে ধোঁকা দিয়ে বিভ্রান্ত করার কাজে শয়তান সদা তৎপর। তার প্রতারণা থেকে রেহাই পাওয়া খুবই কঠিন। তবুও মানুষকে চেষ্টা করতে হবে শয়তানের ধোঁকা থেকে মুক্ত থাকার জন্য। এ লক্ষ্যে নিম্নোক্ত কাজগুলি করতে হবে।


(১) আল্লাহর কাছে শয়তান থেকে আশ্রয় চাওয়া : 
শয়তান যখনই মানুষকে ধোঁকা দেওয়ার চেষ্টা করবে তখন আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে হবে। আল্লাহ বলেন,
وَإِمَّا يَنْزَغَنَّكَ مِنَ الشَّيْطَانِ نَزْغٌ فَاسْتَعِذْ بِاللهِ إِنَّهُ سَمِيْعٌ عَلِيْمٌ-শয়তানের কুমন্ত্রণা যদি তোমাকে প্ররোচিত করে, তবে তুমি আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা কর, তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ (আরাফ ৭/২০০; ফুছছিলাত ৪১/৩৬)। শয়তান থেকে সব সময় আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে হবে। তবে কুরআন-হাদীছে নিম্নোক্ত কয়েকটি স্থানের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে-


(ক) কুরআন তিলাওয়াতের সময় : কুরআন তিলাওয়াত একটি ইবাদত। কুরআনের প্রতিটি হরফ পাঠের বিনিময়ে ১০টি করে নেকী রয়েছে। (তিরমিযী হা/২৯১০; মুসতাদরাকে হাকেম হা/২০৯২; মিশকাত হা/২১৩৮, হাদীছ ছহীহ।) তাই কুরআন তিলাওয়াতের সময় যাতে শয়তান ধোঁকা দিতে না পারে সেজন্য কুরআন তিলাওয়াতের পূর্বে আল্লাহর কাছে শয়তান থেকে আশ্রয় চাওয়ার নিদের্শ দিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন, فَإِذَا قَرَأْتَالْقُرْآنَ فَاسْتَعِذْ بِاللهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ. যখন তুমি কুরআন তিলাওয়াত করবে তখন অভিশপ্ত শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করবে(নাহল ১৬/৯৮)।

(খ) পায়খানা-প্রসাবখানায় প্রবেশের সময় : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) টয়লেটে প্রবেশের সময় বলতেন, بِسْمِ اللهِ اَللَّهُمَّ إِنِّيْأَعُوْذُ بِكَ مِنَ الْخُبُثِ وَالْخَبَائِثِ- (বিসমিল্লা-হি আল্লা-হুম্মা ইন্নী আঊযুবিকা মিনাল খুবুছি ওয়াল খাবা-ইছ)। অর্থ :আল্লাহর নামে প্রবেশ করছি। হে আল্লাহ! আমি পুরুষ ও স্ত্রী জিন শয়তান হতে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি।(বুখারী, মুসলিম, ইবনু মাজাহ হা/২৯৭; মিশকাত হা/৩৩৭।)

(গ) যাদুতে আক্রান্ত হলে বা নযর লাগলে : আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) জিন ও ইনসানের নযর লাগা হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাইতেন। কিন্তু যখন সূরায়ে ফালাক্ব ও নাস নাযিল হল, তখন তিনি সব বাদ দিয়ে কেবল ঐ দুটি সূরা দ্বারা আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন।(বুখারী হা/২৮২২, ৬৩৬৯; নাসাঈ, ইবনু মাজাহ, ছহীহ তিরমিযী, হা/২৪২৫।)

(ঘ) মসজিদে প্রবেশের সময় : আবদুল্লাহ ইবনু আমর ইবনিল আছ (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) যখন মসজিদে প্রবেশ করতেন, তখন তিনি বলতেন, أَعُوْذُ بِاللهِالْعَظِيْمِ وَبِوَجْهِهِ الْكَرِيْمِ وَسُلْطَانِهِ الْقَدِيْمِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيْمِ-(আঊযুবিল্লা-হিল আযীম ওয়া বিওয়াজহিহিল কারীম ওয়া সুলত্বা-নিহিল কাদীম মিনাশ শায়তানির রাজীম)আমি মহান আল্লাহর নিকট বিতাড়িত শয়তান হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। যিনি প্রাচীন রাজত্ব ও মর্যাদাপূর্ণ চেহারার অধিকারী। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আরো বলেন, যদি তুমি এটা বল, তখন শয়তান বলে, সে আমার কাছ থেকে সারাদিনের জন্য নিরাপত্তা পেয়ে গেল।(আবু দাউদ হা/৪৬৬, ‘ছালাত’ অধ্যায়, ‘মানুষ মসজিদে প্রবেশের সময় যা বলবে’ অনুচ্ছেদ, হাদীছ ছহীহ।)

(ঙ) ছালাতে ওয়াসওসা দিলে : ওছমান বিন আবুলআছ (রাঃ) নবী করীম (ছাঃ)-কে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! শয়তান আমার মধ্যে এবং আমার ছালাত ও ক্বিরাআতের মধ্যে অন্তরায় হয়ে আমার ক্বিরাআতে জটিলতা সৃষ্টি করে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, এ হচ্ছে শয়তান, যাকে খিনযাব বলা হয়। তুমি তার আগমন অনুভব করলে আল্লাহর নিকট তিনবার আশ্রয় প্রার্থনা করবে এবং বাম দিকে তিনবার থুক ফেলবে। তিনি (ওছমান) বলেন, এরপর থেকে আমি এমনটি করি। ফলে আল্লাহ তাকে আমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেন।(মুসলিম হা/২২০৩; মিশকাত হা/৭৭ ‘ঈমান’ অধ্যায়।)

(চ) রাগের সময় : রাগ শয়তানের পক্ষ থেকে আসে। তাই রাগের সময় শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে হবে। সুলায়মান ইবনু সূরাদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সঙ্গে উপবিষ্ট ছিলাম। তখন দুজন লোক গালাগালি করছিল। তাদের একজনের চেহারা লাল হয়ে গিয়েছিল এবং তার রগগুলো ফুলে গিয়েছিল। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, আমি এমন একটি দোআ জানি, এই লোকটি তা পড়লে তার রাগ দূর হয়ে যাবে। সে যদি পড়ে আঊযুবিল্লা-হি মিনাশ শায়তানির রাজীম তবে তার রাগ চলে যাবে। তখন সুলায়মান তাকে বলল, নবী (ছাঃ) বলেছেন, তুমি আল্লাহর নিকট শয়তান থেকে আশ্রয় চাও। সে বলল, আমি কি পাগল হয়েছি।(বুখারী হা/৩২৮২ ‘সৃষ্টির সূচনা’অধ্যায়; মুসলিম হা/২৬১০।)

(ছ) খারাপ স্বপ্ন দেখলে : ক্বাতাদাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, সৎ ও ভাল স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়ে থাকে। আর মন্দ স্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে হয়ে থাকে। কাজেই তোমাদের কেউ যখন ভয়ানক মন্দ স্বপ্ন দেখে তখন সে যেন তার বাম দিকে থুকু ফেলে এবং শয়তানের ক্ষতি হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চায়। তাহলে এমন স্বপ্ন তার কোন ক্ষতি করতে পারবে না।(বুখারী ‘সৃষ্টির সূচনা’ অধ্যায় ‘ইবলীস ও তার বাহিনী’ অনুচ্ছেদ হা/৩২৯২।)

(জ) বাড়ি হতে বের হওয়ার সময় : আনাস বিন মালেক (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি ঘর থেকে বের হওয়ার সময় বলে বিসমিল্লা-হি তাওয়াক্কালতু আলাল্লা-হি ওয়া লা হাওলা ওয়ালা কুউওয়াতা ইল্লা বিল্লা-হ তখন তার জন্য বলা হয়, তোমার জন্য যথেষ্ট হয়েছে, তুমি রক্ষা পেয়েছ এবং শয়তান তার থেকে দূরে সরে যায়।(আবূদাঊদ হা/৫০৯৫; তিরমিযী হা/৩৪২৬ ‘দো‘আ’ অধ্যায়; ইবনু হিববান হা/২৩৭০; মিশকাত হা/২৪৪৩, হাদীছ ছহীহ।)

অপর একটি হাদীছে এসেছে,  ‘তার জন্য অন্য শয়তান বলে, ঐ লোককে তুমি কিভাবে পথভ্রষ্ট করবে যে ইতিমধ্যে হেদায়াতপ্রাপ্ত হয়েছে, তার জন্য যথেষ্ট হয়েছে এবং রক্ষা পেয়েছে।(আবূদাঊদ হা/৫০৯৫ ‘আদব’অধ্যায়; হাদীছ ছহীহ, ছহীহ তিরমিযী, হা/৩৬৬৬।)

(ঝ) স্ত্রী সহবাসের সময় : ইবনু আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, তোমাদের কেউ স্ত্রীর কাছে এসে যেন বলে, بِسْمِ اللهِ اَللَّهُمَّ جَنِّبْنَا الشَّيْطَانَ وَجَنِّبِالشَّيْطَانَ مَا رَزَقْتَنَا- (বিসমিল্লাহি আল্লা-হুম্মা জান্নিবনা শায়তানা ও জান্নিবিশ শায়তানা মা রাযাকতানা)। অর্থ- বিসমিল্লাহ। হে আল্লাহ! আমাদেরকে শয়তানের প্রভাব থেকে দূরে রাখ। আর আমাদের যে সন্তান দান করবে তাকেও শয়তানের প্রভাব থেকে বাঁচিয়ে রাখ। অতঃপর তাদেরকে যে সন্তান দেয়া হবে শয়তান তার কোন ক্ষতি করতে পারবে না।(বুখারী হা/১৪১, ৩২৭১ ‘অযূ’অধ্যায়; মুসলিম হা/১৪৩৪ ‘ত্বালাক’ অধ্যায়; আহমাদ হা/১৯০৮।)

(ঞ) কাউকে বিদায় দেওয়ার সময় : আবদুল্লাহ ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) হাসান ও হুসাইন (রাঃ)-কে আল্লাহর আশ্রয়ে সোপর্দ করতেন এবং বলতেন, তোমাদের পিতা ইবরাহীম (আঃ) ইসমাঈল ও ইসহাক্বকে এই বলে আল্লাহর আশ্রয়ে সোপর্দ করতেন,أَعُوْذُ بِكَلِمَاتِ اللهِ التَّامَّةِ مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ وَهَامَّةٍ وَمِنْ كُلِّ عَيْنٍلاَمَّةٍ- আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ বাণীগুলির আশ্রয় নিচ্ছি প্রত্যেক শয়তান ও দুশ্চিন্তা সৃষ্টিকারী বস্তু হতে এবং প্রত্যেক অনিষ্টকর দৃষ্টি হতে।(বুখারী হা/৩৩৭১‘নবীদের কাহিনী’ অধ্যায়।)

(২) কুরআন তিলাওয়াত করা :
(ক) সূরা বাক্বারাহ পাঠ করা : রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, 
তোমাদের ঘরগুলোকে কবরে পরিণত করো না। যে ঘরে সূরা বাক্বারাহ পাঠ করা হয়, সে ঘর থেকে শয়তান পালিয়ে যায়।(মুসলিম হা/৭৮০; রিয়াযুছ ছালেহীন হা/১০১৮; মিশকাত হা/২১১৯।)

(খ) আয়াতুল কুরসী পাঠ করা : আবূ আউয়ূব আনছারী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তাঁর খেজুর বাগানে ছোট্ট একটি মাচান ছিল। তিনি তাতে শুকনো খেজুর রাখতেন। রাতে শয়তান জিন এসে মাচান থেকে খেজুর নিয়ে যেত। তিনি এ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কাছে নালিশ করলেন। তিনি বললেন, যাও, এটিকে তুমি যখন দেখতে পাবে তখন বলবে বিসমিল্লা-হ, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) তোমাকে ডেকেছেন। রাবী বলেন, জিন আসতেই তিনি তাকে ধরে ফেলেন। সে তখন কসম করে বলল যে, আর কখনও আসবে না। কাজেই তাকে তিনি ছেড়ে দিলেন। অতঃপর তিনি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কাছে আসলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমার বন্দী কি করেছে? তিনি বললেন, সে শপথ করেছে যে, সে আর কখনো আসবে না। তিনি বললেন, সে মিথ্যা বলেছে এবং সে তো মিথ্যা বলায় অভ্যস্ত। রাবী বলেন, এরপর তিনি তাকে আবার ধরলেন। এবারও সে শপথ করে বলল যে, সে আর আসবে না। তিনি তাকে ছেড়ে দিলেন। অতঃপর তিনি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কাছে হাযির হলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কি হে! তোমার বন্দীর কি খবর? তিনি বলেন, সে কসম করে বলেছে যে, সে আর আসবে না, এজন্য আমি তাকে ছেড়ে দিয়েছি। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, সে এবারও মিথ্যা বলেছে, আর সে মিথ্যা বলায় অভ্যস্ত। রাবী বলেন, তিনি আবার তাকে ধরে ফেলেন এবং বলেন, আমি তোমাকে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কাছে না নিয়ে ছাড়ছি না। সে বলল, আমি আপনাকে একটি বিষয় স্মরণ করাতে চাই। আপনি আপনার ঘরে আয়াতুল করসী পাঠ করবেন। তাহলে কোন শয়তান বা অন্য কিছু এতে প্রবেশ করতে পারবে না। এবার তিনি রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর কাছে হাযির হলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমার বন্দী কি করেছে? রাবী বলেন, আমি রাসূল (ছাঃ)-কে জিনের কথা বললাম। তিনি বললেন, সে মিথ্যাবাদী হলেও একথাটি সত্য বলেছে।(ছহীহ তিরমিযী হা/২৮৮০। )
উবাই বিন কাব (রাঃ)-এর ব্যাপারেও এ রকম একটি ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।(ছহীহ ইবনে হিববান, হা/৭৮১, ২/৬১ পৃঃ; নাসাঈ, ত্বাবারাণী, ছহীহ তারগীব, হা/৬৬২, ১/৪১৭ পৃঃ, হা/১৪৭০, ২/১৮৮ পৃঃ।)

(৩) ইখলাছ অবলম্বন করা : 
শয়তান সকলকে ধোঁকা দিয়ে জাহান্নামী করতে পারলেও ইখলাছ অবলম্বনকারীকে ধোঁকা দিতে পারে না। শয়তান আল্লাহর কাছে এই ওয়াদা করেছে যে, 
 সে (শয়তান) বলল, হে আমার পালনকর্তা! আপনি যেমন আমাকে পথভ্রষ্ট করেছেন, আমিও তাদের সবাইকে পৃথিবীতে নানা সৌন্দর্যে আকৃষ্ট করব এবং তাদের সবাইকে পথভ্রষ্ট করব। তাদের মধ্যে আপনার একনিষ্ঠ বান্দাদের ব্যতীত(হিজর ১৫/৩৯-৪০)
অন্য আয়াতে এসেছে, সে (শয়তান) বলল, হে আমার প্রতিপালক! আপনার কসম, আমি তাদের সবাইকে পথভ্রষ্ট করব। তাদের মধ্যে আপনার একনিষ্ঠ বান্দাদের ব্যতীত (ছোয়াদ ৩৮/৮২-৮৩)

(৪) সকালে উঠে ফজর ছালাত আদায় করা :
মানুষ রাত্রে ঘুমানোর পরে শয়তান মানুষকে বেশী ঘুমানের জন্য এবং ফজর ছালাত কাযা করানোর জন্য বহু চেষ্টা করে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, 
যখন তোমাদের কেউ ঘুমায় শয়তান তার মাথার পিছন দিকে তিনটি গিরা দেয় এবং প্রত্যেক গিরার উপর মোহর মেরে বা থাবা মেরে বলে, রাত অনেক আছে তুমি নিশ্চিন্তে ঘুমাও। যদি সে জাগে ও দোআ পড়ে তাহলে একটি গিরা খুলে যায়। তারপর সে ওযূ করলে আরও একটি গিরা খুলে যায়। অতঃপর সে ছালাত আদায় করলে অপর গিরাটিও খুলে যায় এবং সে সকালে প্রফুল্ল­ মনে, পবিত্র অন্তরে সকাল করে। অন্যথা সে সকালে উঠে কলুষিত অন্তর ও অলস মনে।(বুখারী হা/৩২৬৯ ‘সৃষ্টির সূচনা’ অধ্যায়; মুসলিম, মিশকাত হা/১২১৯; বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/১১৫১। )
অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, তোমাদের কেউ যখন ঘুম থেকে উঠে এবং ওযূ করে তখন তার উচিৎ তিনবার নাক ঝেড়ে ফেলা। কারণ শয়তান তার নাকের ছিদ্রে রাত কাটিয়েছে।(বুখারী হা/৩২৯৫; মুসলিম হা/২৩৮।) 
আবদুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সামনে এক ব্যক্তি সম্পর্কে আলোচনা করা হল, যে সকাল পর্যন্ত ঘুমিয়ে কাটিয়েছে, ছালাতের জন্য (যথাসময়ে) জাগ্রত হয়নি, তখন তিনি বললেন, শয়তান তার কানে পেশাব করে দিয়েছে।(বুখারী হা/১১৪৪ ‘তাহাজ্জুদ’ অধ্যায়; মুসলিম হা/৭৭৪।)

(৫) আল্লাহকে স্মরণ করা :
আল্লাহকে স্মরণ করলে শয়তান কাছে আসতে পারে না। আল্লাহর স্মরণ থেকে মানুষ যখন দূরে চলে যায়, তখন শয়তান তাদের বন্ধু হয়। আল্লাহ বলেন, 
যে ব্যক্তি দয়াময় আল্লাহর স্মরণ থেকে চোখ ফিরিয়ে নেয়, আমি তার জন্য এক শয়তান নিয়োজিত করে দেই, অতঃপর সে-ই হয় তার সঙ্গী। শয়তানরাই মানুষকে সৎ পথে বাধা দান করে, আর মানুষ মনে করে যে, তারা সৎ পথেই রয়েছে (যুখরুফ ৪৩/৩৬-৩৭)

(৬) তাহলীল পাঠ করা : 
আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, 
যে ব্যক্তি প্রতিদিন ১০০ বার বলবে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকালাহু লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লী শাইইন কাদীর। অর্থ: আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই। তিনি এক, তাঁর কোন শরীক নেই, সমস্ত রাজত্ব তাঁর। সমস্ত প্রসংশা তাঁর, তিনি সমস্ত বস্তুর উপর শক্তিশালী সে ১০টি গোলাম আযাদ করার সমান ছওয়াব পাবে। তার নামে লেখা হবে ১০০টি নেকী এবং তার নাম থেকে ১০০টি গুনাহ মুছে ফেলা হবে। সেদিন সন্ধ্যা হওয়া পর্যন্ত শয়তানের সংশ্রব থেকে সংরক্ষিত থাকবে। আর ক্বিয়ামতের দিন কেউ তার চাইতে ভাল আমল আনতে পারবে না, একমাত্র সেই ব্যক্তি ছাড়া যে তার চাইতে বেশী আমল করেছে।(বুখারী হা/৬৪০৩; মুসলিম, রিয়াযুছ ছালেহীন হা/১৪১০।)

(৭) জামাআতবদ্ধভাবে থাকা : 
ইসলাম মুসলিম জাতিকে জামা
আতবদ্ধ থাকার নির্দেশ দিয়েছে। কারণ একাকী থাকা শয়তানের কাজ। জামাআতে ছালাত আদায়ের নির্দেশ দিয়ে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,যে গ্রামে বা প্রান্তরে তিনজন লোকও অবস্থান করে অথচ তারা জামাআত কায়েম করে ছালাত আদায় করে না, তাদের উপর শয়তান সওয়ার হয়ে যায়। কাজেই জামাআতের সাথে ছালাত পড়া তোমাদের জন্য অপরিহার্য। কারণ দলত্যাগী বকরীকে বাঘে ধরে খায়।(আবূদাঊদ হা/৫৪৭; রিয়াযুছ ছালেহীন হা/১০৭০; মিশকাত হা/১০৬৭, হাদীছ হাসান।)

সফর অবস্থায় জামাআতের সাথে থাকার কথা উল্লেখ করে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, একজন সওয়ার হচ্ছে একটি শয়তান (শয়তানের মত), দুজন সওয়ার দুটি শয়তান, আর তিনজন সওয়ার হচ্ছে কাফেলা।(আবূদাঊদ হা/২৬০৭; তিরমিযী হা/১৬৭৪; মিশকাত হা/৯৫৯; রিয়াযুছ ছালেহীন হা/৩৯১০; সিলসিলা ছহীহাহ হা/৬৪, হাদীছ হাসান।)

(৮) তিলাওয়াতের সিজদা আদায় করা :
আবু হুরায়রা (রাঃ) হ
তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, যখন আদম সন্তান সিজদার আয়াত তিলাওয়াত করে সিজদা করে, তখন শয়তান দূরে সরে গিয়ে কাঁদতে থাকে আর বলে যে, হায়! আবূ কুরাইবের বর্ণনায় এসেছে, হায় দুর্ভোগ আমার জন্য। বনী আদমকে সিজদার আদেশ দেয়া হলে সে সিজদা করল ও জান্নাতী হল। আর আমাকে সিজদার আদেশ দিলে আমি অবাধ্য হলাম ও জাহান্নামী হলাম।(মুসলিম. মিশকাত হা/৮৯৫; ইবনু মাজাহ হা/১০৫২।)

(৯) তাশাহ্হুদের সময় ডান হাতের আঙ্গুল দ্বারা ইশারা করা : 
নাফে
 (রাঃ) বলেন, আবদুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) যখন ছালাতে (শেষ বৈঠকে) বসতেন, তখন তিনি তার হাত হাটুর উপরে রাখতেন, আঙ্গুল দ্বারা ইশারা করতেন এবং চক্ষু সেখানে রাখতেন। অতঃপর তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ  (ছাঃ) বলেছেন, এটি অর্থাৎ তর্জনী আঙ্গুল নাড়ানো শয়তানের বিরুদ্ধে লোহা অপেক্ষা কঠিন।(আহমাদ, মিশকাত হা/৯১৭ ‘তাশাহুদ’ অনুচ্ছেদ, হাদীছ হাসান।)

(১০) আযান ও ইক্বামত :
আবু হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
যখন ছালাতের আযান দেওয়া হয়, তখন শয়তান বায়ু নিঃসরণ করতে করতে পিছু হটে যায়। আযান শেষ হয়ে গেলে আবার ফিরে আসে। তারপর ইক্বামতকালে শয়তান আবার হটে যায়। ইক্বামত শেষে সে এসে মানুষ ও তার অন্তরের মাঝে অবস্থান নেয় এবং বলতে শুরু করে যে, তুমি এটা স্মরণ কর, ওটা স্মরণ কর। শেষ পর্যন্ত লোকটি ভুলেই যায় যে, সে ছালাত তিন রাকআত পড়ল, নাকি চার রাকআত। তারপর তিন রাকআত পড়ল, নাকি চার রাকআত পড়ল তা নির্ণয় করতে না পারলে সে যেন দুটি সিজদা করে নেয়।(বুখারী হা/৩২৮৫ ‘সৃষ্টির সূচনা’অধ্যায় ।)

(১১) সিজদায়ে সহো করা : 
ছালাতে শয়তান বিভিন্নভাবে মানুষের মনে খটকা সৃষ্টি করে। ফলে মানুষ ছালাতের মধ্যে কত রাক
আত পড়েছে তা ভুলে যায়। তাই শয়তান ছালাতে খটকা সৃষ্টি করলে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) সহো সিজদার নির্দেশ দিয়েছেন।(বুখারী হা/৩২৮৫ ‘সৃষ্টির সূচনা’ অধ্যায়।)

(১২) ছালাতের কাতার সোজা করা ও ফাঁকা না রাখা : ছালাতে কাতার সোজা করে দাঁড়ানো যরূরী। আর দুজনের মাঝখানে ফাঁকা রাখা ঠিক নয়। কারণ ফাঁকা রাখলে শয়তান মাঝখানে দাঁড়ায়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, তোমাদের কাতারগুলোকে মিলাও এবং পরস্পর নিকটবর্তী হয়ে যাও, আর কাঁধের সাথে কাঁধ মিলাও। সেই সত্তার কসম যাঁর হাতে আমার প্রাণ! আমি শয়তানদেরকে কাতারের মধ্যে এমনভাবে ঢুকতে দেখি, যেমন ছোট ছাগল ঢোকে।(আবূদাউদ হা/৬৬৭ হাদীছ ছহীহ; মিশকাত হা/১০৯৩; রিয়াযুছ ছালেহীন হা/১০৯২।)

অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ছালাতের জন্য কাতারবদ্ধ হও, কাঁধ মিলাও, ফাঁকা বন্ধ কর, নিজের ভাইয়ের প্রতি কোমল হও এবং শয়তানের জন্য পথ ছেড়ে দিও না।(আবূদাউদ হা/৬৬৬; হাদীছ ছহীহ, রিয়াযুছ ছালেহীন হা/১০৯১।)

(১৩) ঘরে প্রবেশকালে ও খাবার সময় বিসমিল্লাহ বলা এবং ডান হাতে আহার করা :
বাড়িতে বা গৃহে প্রবেশকালে বিসমিল্লাহ বলে প্রবেশ করতে হবে। কেননা রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, 
যখন কোন ব্যক্তি তার গৃহে প্রবেশ করে এবং প্রবেশকালে ও খাওয়ার সময় আল্লাহকে স্মরণ করে, তখন শয়তান (তার অনুসারীদেরকে) বলে, এই ঘরে তোমাদের জন্য রাত্রি যাপনের কোন সুযোগ নেই এবং খাদ্যও নেই। আর যখন সে আল্লাহর নাম ছাড়া প্রবেশ করে তখন শয়তান বলে, তোমরা রাত্রি যাপনের জায়গা পেলে। আর যখন সে খাওয়ার সময় আল্লাহকে স্মরণ করে না তখন শয়তান বলে, তোমরা থাকা ও খাওয়া উভয়টির সুযোগ পেলে।(মুসলিম ‘খাদ্য’ অধ্যায় হা/২০১৮; মিশকাত হা/৪১৬১।)
খাওয়ার আগে বিসমিল্লাহ বলে ডান হাতে খাবার খেতে হবে। বিসমিল্লাহ না বললে শয়তান সেই খাবারে অংশ নেয়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, শয়তান সেই খাদ্যকে নিজের জন্য হালাল করে নেয়, যাতে বিসমিল্লাহ বলা হয় না।(মুসলিম, মিশকাত হা/৪১৬১ ‘খাদ্য’ অধ্যায়।)
ডান হাতে খাবার খাওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, তোমাদের কেউ যেন তার ডান হাত দ্বারা পানাহার করে এবং ডান হাত দ্বারা আদান-প্রদান করে। কেননা শয়তান বাম হাত দ্বারা পানাহার করে এবং বাম হাত দ্বারাই আদান-প্রদান করে।(সিলসিলা ছহীহাহ হা/১২৩৬।)

(১৪) খাদ্য পরিপূর্ণভাবে খাওয়া, এমনকি পড়ে গেলে সেটা উঠিয়ে নেওয়া : 
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, 
তোমাদের কারও খাবারের কোন লোকমা পড়ে গেলে সে যেন তা উঠিয়ে নেয় এবং তার ময়লা পরিস্কার করে খেয়ে ফেলে। শয়তানের জন্য যেন রেখে না দেয়। কাজেই তোমাদের কারও কোন লোকমা  পড়ে গেলে, তার ময়লা পরিস্কার করে খেয়ে ফেলা উচিৎ এবং শয়তানের জন্য রেখে দেওয়া উচিত নয়।(মুসলিম, রিয়াযুছ ছালেহীন হা/১৬৪।)

(১৫) শয়নকালে আয়াতুল কুরসী পাঠ করা :
আবু হুরায়রা (রাঃ) হ
তে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল (ছাঃ) আমাকে রামাযানের যাকাত সংরক্ষণের দায়িত্ব প্রদান করলেন। অতঃপর আমার নিকট এক আগন্তুক আসল। সে তার দুহাতের আঁজলা ভরে খাদ্যশস্য গ্রহণ করতে লাগল। তখন আমি তাকে ধরে ফেললাম এবং বললাম, আমি অবশ্যই তোমাকে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর নিকট নিয়ে যাব। তখন সে একটি হাদীছ উল্লেখ করল এবং বলল, যখন তুমি বিছানায় শুতে যাবে, তখন আয়াতুল কুরসী পড়বে, তাহলে সর্বদা আল্লাহর পক্ষ হতে তোমার জন্য একজন হেফাযতকারী থাকবে এবং সকাল হওয়া অবধি তোমার নিকট শয়তান আসতে পারবে না। তখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বললেন, সে তোমাকে সত্য বলেছে, অথচ সে মিথ্যাচারী এবং শয়তান ছিল।(বুখারী হা/৩২৭৫ ‘সৃষ্টির সূচনা’ অধ্যায়।)

(১৬) যথাসম্ভব হাই তোলা থেকে বিরত থাকা :
হাই তুললে শয়তান হাসতে থাকে এবং মুখ দিয়ে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। তাই যথাসম্ভব হাই তোলা থেকে বিরত থাকা অথবা হাই আসলে হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরতে হবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, 
তোমাদের কারো হাই আসলে, সে যেন তার হাত মুখের উপরে দেয়। কারণ (এ সময়) শয়তান ভিতরে ঢুকে পড়ে।(মুসলিম, মিশকাত হা/৪৭৩৭ ‘হাচি ও হাই তোলা’অনুচ্ছেদ।)
অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, হাই তোলা শয়তানের পক্ষ হতে হয়ে থাকে। কাজেই তোমাদের কারো যখন হাই আসবে তখন যথাসম্ভব তা রোধ করবে। কারণ তোমাদের কেউ হাই তোলার সময় যখন হা বলে তখন শয়তান হাসতে থাকে।(বুখারী হা/৩২৮৯ ‘সৃষ্টির সূচনা’অধ্যায়; মুসলিম হা/২৯৯৪।)

(১৭) রাতে ঘরের বাতি নিভিয়ে খাবার পাত্র ঢেকে রাখা :
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, 
(রাতে) তোমাদের ঘরের বাতি নিভিয়ে দাও এবং আল্লাহর নাম স্মরণ কর। তোমার পানি রাখার পাত্রের মুখ ঢেকে রাখ এবং আল্লাহর নাম স্মরণ কর। তোমরা বাসন-কোসন ঢেকে রাখ এবং আল্লাহর নাম স্মরণ কর। সামান্য কিছু হলেও তার ওপর দিয়ে দাও।(বুখারী হা/৩২৮০ ‘সৃষ্টির সূচনা’ অধ্যায়; মুসলিম হা/২০১২; আহমাদ হা/১৪৮৩৫।)

(১৮) কারো প্রতি অস্ত্র দ্বারা ইশারা না করা : 
ঠাট্টা করতে করতে অনেক সময় মানুষ আনাকাঙ্খিত কিছু কাজ করে ফেলে। আর এ কাজ করতে শয়তান সাহায্য করে। তাই কারো প্রতি অস্ত্র দ্বারা ইঙ্গিত থেকে সম্পূর্ণরূপে বিরত থাকতে হবে। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, 
তোমাদের কেউ যেন তার ভাইয়ের প্রতি অস্ত্র দ্বারা ইশারা না করে। কেননা সে জানে না হয়তো শয়তান তার হাতে আঘাত করবে। ফলে সে জাহান্নামের গর্তে নিক্ষিপ্ত হবে।(বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৩৫১৮।) 
(১৯) ঈমান আনা ও আল্লাহর ওপর ভরসা করা : 
ঈমান আনার সাথে সাথে সৎকাজ করতে হবে এবং আল্লাহর উপর ভরসা করতে হবে। তাহ
লে শয়তানের অনিষ্ট থেকে মুক্ত থাকা যাবে। আল্লাহ বলেন,  তার (শয়তানের) কোন আধিপত্য নেই তাদের উপর যারা ঈমান আনে ও তাদের প্রতিপালকের উপরই নির্ভর করে(নাহল ১৬/৯৯)

(২০) নির্দিষ্ট কিছু আমল :
জাবির (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, 
রাত যখন আচ্ছন্ন হয় তখন তোমাদের শিশু-কিশোরদের ঘরে আটকে রাখবে। কারণ শয়তান এ সময়ে ছড়িয়ে পড়ে। তারপর রাতের কিছু সময় পার হয়ে গেলে তাদেরকে ছেড়ে দিবে এবং দরজা বন্ধ করে আল্লাহর নাম নেবে। বাতি নিভিয়ে দিবে ও আল্লাহর নাম উচ্চারণ করবে। পানপাত্রের মুখ বেঁধে রাখবে ও আল্লাহর নাম উচ্চারণ করবে এবং পাত্র ঢেকে রাখবে ও আল্লাহর নাম উচ্চারণ করবে। তার উপর কিছু একটা ফেলে রেখে হলেও তা করবে।(বুখারী, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, অনুঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ১ম খন্ড, পৃঃ ১৫৭।)
পরিশেষে বলব, শয়তান মানুষের আজন্ম শত্রু। তার কবল থেকে মুক্তি লাভের জন্য সকাল-সন্ধ্যা কুরআন তেলওয়াত করতে হবে এবং আল্লাহর উপর ভরসা রেখে উপরোক্ত কাজগুলি নিষ্ঠার সাথে পালন করতে হবে। তাহলে তার ধোঁকা থেকে বেঁচে থাকা যাবে। আল্লাহ আমাদেরকে শয়তানের অনিষ্ট থেকে পরিত্রাণ লাভের তাওফীক্ব দিন-আমীন!
Widget ByBlogger Maruf
Widget ByBlogger Maruf